কাক এখন কাকের মাংস খায়!

ইকতেদার আহমেদ
আমাদের এ পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের পাখি রয়েছে। বেশির ভাগ পাখি গাছে বাসা বাঁধে। কিছু কিছু পাখি পোষা পাখি হিসেবে শৌখিন মানুষেরা তাদের গৃহে বা গৃহের আঙিনায় লালনপালন করে থাকে। এমন কিছু পাখি আছে যেগুলো মানুষের শেখানো বুলি আওড়াতে পারে। চড়ই ও কবুতর এ দু’টি পাখি গাছের ডালে বাসা না বেঁধে মানুষের গৃহের চালের কোণে বাসা বাঁধতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সব ধরনের পাখি নিজের পাড়া ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায়। এর মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম হলো কোকিল। কোকিলকে পাখিদের মধ্যে খুব চালাক ভাবা হয়। কোকিল অত্যন্ত কৌশলে কাকের বাসা থেকে কাকের ডিম ফেলে দিয়ে সেখানে ডিম পাড়ে এবং পরবর্তীতে কোকিলের ডিমে তা দিয়ে কাক কোকিলের জন্ম দেয়। কাক পাখি হলেও এ পাখিটিকে কেউ পোষা পাখি হিসেবে লালনপালন করে না। কাকের গায়ের বর্ণ কালো। আমাদের দেশে দু’ধরনের কাক দেখা যায়। এর একটি হলো দাঁড়কাক এবং অপরটি পাতিকাক। দাঁড়কাক আকৃতিতে একটু বড়; তবে সংখ্যার বিবেচনায় আমাদের চার পাশে পাতিকাক বেশি দেখা যায়। স্বভাবগতভাবে কাক নোংরা প্রকৃতির। কাক সাধারণত ময়লা আবর্জনা থেকে তার খাবার সংগ্রহ করে। খাওয়ার ব্যাপারে কাকের তেমন একটা বাছবিচার নেই। খাওয়ার ব্যাপারে বাছবিচার না থাকলেও এক কাক অন্য কাকের মাংস খায় না। এ ব্যাপারে কাকের নীতিবোধ ও নৈতিকতা প্রবল। কাকের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হলো কাক খুব বেশি সমব্যথী। আমাদের দেশে যেকোনো দুর্ঘটনায় একটি কাকের মৃত্যু ঘটলে আশপাশের সব কাক সে কাকটিকে ঘিরে কা কা রবে সমবেদনা জানাতে থাকে। আবার দেখা যায়, একটি কাক অন্য কোনো পাখি বা প্রাণী দ্বারা আক্রান্ত হলে অপরাপর কাক সম্মিলিতভাবে আক্রান্ত কাকের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে এসে আক্রান্তকারীকে প্রতিহত করতে সচেষ্ট হয়। ‘কাকের মাংস কাকে খায় না’Ñ এ প্রবাদটির সাথে আমাদের দেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষের পরিচয় রয়েছে। সাধারণ্যে এ বাক্যটি ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হয়। এ বাক্যটির ভাবার্থ হলো স্বজাতির কেউ ক্ষতি করে না বরং যে কোনো ধরনের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।
পৃথিবীর যেকোনো দেশে চিকিৎসা পেশায় যারা নিয়োজিত মানবসেবার মহান ব্রত নিয়ে তারা পেশাটিকে বেছে নেন। চিকিৎকদের অনেকে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত আবার অনেকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসক হিসেবে কার্য সম্পাদন করে থাকেন। সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও অফিসের নির্ধারিত সময়ের বাইরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে রোগী দেখার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বিধিনিষেধ নেই। চিকিৎসকরা মানুষের রোগ নিরাময়ে বিশেষ ভূমিকা রেখে থাকলেও তারা নিজেরা রোগ থেকে মুক্তÑ এ কথা বলা যাবে না। বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। বর্তমানে মানুষের বিভিন্ন ধরনের রোগের জন্য এবং মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসক রয়েছে। এখন বেশির ভাগ মানুষ রোগ নির্ণয়ান্তে বিশেষজ্ঞ চিকিৎকদের দ্বারস্থ হয়। সুদূর অতীত থেকে দেখা গেছে, কোনো চিকিৎসক রোগে আক্রান্ত হলে একই পেশায় নিয়োজিত অপর চিকিৎসক তাকে বিনা পারিশ্রমিকে সেবা দিতেন। এ সেবার পরিধি থেকে অনেক সময় দেখা যায় চিকিৎসকদের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, পিতামাতাও বাইরে নন। যে নীতিবোধ ও নৈতিকতা থেকে অতীতে চিকিৎসকরা রোগ নিরাময়ে সেবার হাত প্রশস্ত করতেন বর্তমানে আগের সে নীতিবোধ ও নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণে সে সেবার হাত অতীতের মতো আর প্রশস্ত নয়। আর তাই আজকাল দেখা যায় একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক একজন সাধারণ চিকিৎসককে পরীক্ষা করে ফি বাবদ অর্থ নিতে বিবেক দ্বারা বারিত হন না। সুদূর অতীতে যারা আইন পেশায় নিয়োজিত হতেন তাদের প্রায় সবাই নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। এমন অনেক নীতিবান ও দৃঢ় চরিত্রের আইনজীবীর কথা শোনা যায় যারা মক্কেল নিয়োজিত হওয়ার পর মামলা সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত মক্কেল দেয় টাকা ব্যয় করতে দ্বিধাবোধ করতেন। বিভিন্ন জেলায় যারা আইন পেশায় নিয়োজিত অতীতে তাদের মধ্য থেকে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা পরিচালনায় যারা নিষ্ঠাবান ও পারদর্শী হিসেবে খ্যাত তাদের জিপি বা পিপি অথবা তাদের সহযোগী হিসেবে নিয়োগ দেয়ার ব্যাপারে অগ্রাধিকার দেয়া হতো। একটি জেলার আইনজীবী হিসেবে জিপি বা পিপি পদ যেকোনো আইনজীবীর জন্য সম্মানের হলেও অতীতে অনেক প্রথিতযশা ও ন্যায়নিষ্ঠ আইনজীবী নিজের আইন পেশার ক্ষতি হবে এ বিবেচনায় জিপি বা পিপি পদের প্রস্তাব বিনয়ের সাথে ফিরিয়ে দিতেন। কিন্তু অতীতের সে আত্মত্যাগ আজ খুব একটা দেখা যায় না। বিগত চার দশকের অধিক সময় থেকে দেখা গেছে, জিপি ও পিপি হওয়ার জন্য আইনজীবীদের মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা এবং বর্তমানে একজন আইনজীবীর পেশাগত সততা ও দক্ষতার চেয়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি তার রাজনৈতিক আনুগত্য জিপি বা পিপি নিয়োগের ক্ষেত্রে অধিক বিবেচ্য। একজন জিপি বা পিপি রাষ্ট্র বা সরকারের স্বার্থ সমুন্নত রাখার ব্যাপারে সদা সর্বদা সচেষ্ট থাকবেন এটি কাক্সিক্ষত হলেও তা যে বর্তমানে প্রতিনিয়ত উপেক্ষিত হচ্ছে তা বোধ করি আইন পেশাসংশ্লিষ্ট ও দেশবাসীর বুঝবার অবশিষ্ট নেই।
অতীতে দেখা যেত, একজন আইনজীবী অপর আইনজীবীর ব্যক্তিগত মামলা বিনা পারিশ্রমিকে পরিচালনা করে নীতি ও নৈতিকতার দৃষ্টান্ত সমুজ্জ্বল রাখতেন। বর্তমানে বিভিন্নমুখী অবক্ষয়ের কারণে সে সমুজ্জ্বলতা মলিন। এখন আইনজীবীরা যেসব রাজনৈতিক মামলা পরিচালনা করলে পদ ও ক্ষমতা পাওয়ার জন্য সহায়ক হবে সেসব মামলা ব্যতীত কদাচিৎ বিনা পারিশ্রমিকে মামলা পরিচালনা করেন। বিভিন্ন জেলায় সরকার দেয় আইনগত সহায়তা তহবিলে অসহায় মানুষের মামলা পরিচালনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য অর্থের সংস্থান করা হলেও বেশির ভাগ আইনজীবী ওই তহবিলের অর্থ দিয়ে মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে অনীহ। এর পেছনের মূল কারণ মামলা পরিচালনার ব্যয় হিসেবে যে অর্থ দেয়া হয় তা আকর্ষণীয় নয়। যদিও জিপি বা পিপি হিসেবে মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র দেয় অর্থের পরিমাণ এর চেয়ে কম আকর্ষণীয় কিন্তু অজানা কারণে সে হিসাব ভিন্ন। আমাদের দেশে বর্তমানে উচ্চ আদালত ও নি¤œ আদালতে ব্যক্তিগত মামলা পরিচালনায় অনেক আইনজীবীর স্বপেশায় নিয়োজিত অগ্রজ, অনুজ বা সতীর্থের প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়ার বিষয়ে অনুযোগ রয়েছে। আমাদের দেশে যারা বিচারকার্যে নিয়োজিত তারা সবাই আইন বিষয়ে ডিগ্রিধারী। এদের অনেকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ লাভ পূর্ববর্তী আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। বিচারকরা সমাজেরই অংশ। একজন বিচারকের পারিবারিক, সামাজিক ও জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধে জড়িত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
বিচারক হিসেবে নিয়োগ লাভ পূর্ববর্তী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত বিচারকরা নিয়োগ পরবর্তী যে নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে পারছেন এ কথাটি আজ সব বিচারকের ক্ষেত্রে সত্য নয়। একজন বিচারকের প্রধান কাজ ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা। এ সত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে একজন বিচারকের কোনো ধরনের অন্যায়ের আশ্রয় গ্রহণের সুযোগ নেই। পেশাগত কারণে একজন বিচারকের সৎ হওয়া অত্যাবশ্যক। আমাদের সমাজে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে যে অবক্ষয়ের ছোঁয়া লেগেছে তা থেকে বিচারক সমাজ অবমুক্ত নয়। একজন বিচারক জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধে জড়িয়ে পড়লে তার পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষার জন্য সুবিচার প্রাপ্তির প্রত্যাশায় নীতিবান ও আদর্শ বিচারককে কখনো অনুরোধ করে থাকলে তাকে বিফল হতে হয় না। কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয় তখন, যখন একজন বিচারক নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত। এরূপ বিচারক অবৈধ অর্থে বশীভূত হয়ে সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষেত্রে আইনকানুনের থোড়াই তোয়াক্কা করেন। এদের কাছে কোনো সহকর্মী বিচারক সঙ্গত অনুরোধ করলে এদের বলতে শোনা যায় এটি বিচার বিভাগ, এখানে বিচারকদের কোনো ধরনের অনুরোধ করা যায় না। একজন বিচারকের পারিবারিক সম্পত্তি অন্যায়ভাবে হুমকির মধ্যে পড়লে তিনি এখতিয়ারাধীন দেওয়ানি বিচারকের আদালতে মামলা করে তার কাছে থেকে আইনানুগ প্রতিকার প্রত্যাশা করেন। ওই বিতর্কিত বিচারক তাকে অনুরোধ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং তিনি কাক্সিক্ষত প্রতিকার না দিলে বিচারপ্রার্থী বিচারককে সামাজিক বিচারের শরণাপন্ন হতে হয়। সামাজিক বিচারে শরণাপন্ন হয়ে তাকে বেশ কিছু পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। এখন প্রশ্ন-ওই বিচারপ্রার্থী বিচারক তার চাহিত আইনানুগ কাক্সিক্ষত প্রতিকারপ্রাপ্ত হলে তাকে অযথা এ বাড়তি ব্যয়ের সম্মুখীন হতে হতো না।
অপর এক ঘটনায় জানা যায়, একজন বিচারকের ভাই বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও অন্যায়ভাবে দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগপত্র ভুক্ত হয়ে বিচারের জন্য সোপর্দ হলে জেলা জজ পদমর্যাদাধারী বিশেষ বিচারকের কাছে আইনানুগ প্রতিকার চাওয়া হয়। প্রতিকারের অনুরোধের সাথে কোনো প্রাপ্তির অঙ্ক না থাকায় ওই বিচারক আইনের মারপ্যাঁচ দেখিয়ে প্রতিকারে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। কিন্তু যে মুহূর্তে জনৈক আইনজীবীর মাধ্যমে বিচারককে সন্তুষ্ট করার মতো প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় তখন দেখা গেল আইনানুগ কাক্সিক্ষত প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে অজানা কারণেই সব বাধা কেটে গেল। আমাদের দেশে পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত থানার একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যে ক্ষমতা ভোগ করেন তার ব্যাপকতা অসীম। আইন পুলিশকে এমন ক্ষমতা দিয়েছে যে, নেহাত সন্দেহের বশবর্তী হয়ে ধর্তব্য অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত বিবেচনায় পুলিশ যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারে। কিন্তু অতীতে পুলিশের সব স্তরে জবাবদিহিতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হতো বিধায় কোনো কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করলেও তিনি বিভাগীয় ব্যবস্থা হতে নিষ্কৃতি পেতেন না। বিগত চার দশকেরও অধিক সময় ধরে অতীতের সে জবাবদিহিতার আর বালাই নেই। বর্তমানের চেয়ে অতীতের পুলিশ তুলনামূলক বিচারে অন্যায় ও অনিয়মের সাথে কম সম্পৃক্ত হলেও বহুকাল আগে থেকেই পুলিশ সম্পর্কে একটি ধারণা বহুল প্রচারিত ছিল যে, দক্ষিণা না জুটলে পুলিশ বাপকেও ছাড়ে না। অতীতে নগণ্যসংখ্যক কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এ কথাটি সত্য ছিল। কিন্তু আজ এ কথাটি সত্য নয়, এ দাবি কি জোর দিয়ে করা যাবে? যেকোনো সমাজের অবক্ষয় হলে তা সমাজের সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে স্পর্শ করে। মানুষকে আল্লাহ পাক যে বিবেকবুদ্ধি দিয়েছেন তা অন্য কোনো প্রাণীকে দেননি। তাই জন্মগতভাবে একটি প্রাণীর ক্ষেত্রে যা সহজাত তা মানুষরূপী প্রাণীর ক্ষেত্রে সহজাত নয়। কাক কাকের মাংস খায় না- এটি জন্মগত সহজাত গুণ হিসেবে চির সত্য। এ পৃথিবীতে যত দিন কাকের অস্তিত্ব থাকবে তত দিন এ সত্যের অন্যথা হবে না। কিন্তু আমাদের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে যারা স্বজাতির ব্যথায় সমব্যথী বা সহমর্মী নন বরং অন্যায় বা অনৈতিকভাবে প্রাপ্তির যোগ না থাকায় মুখ ফিরিয়ে নেন ‘কাক কাকের মাংস খায় না’Ñ- প্রবাদটি তাদের ক্ষেত্রে সত্য নয় এ কথাটি কি বলা যাবে? আর বলা না গেলে বলতে বাধা কোথায়Ñ কাক এখন কাকের মাংস খায়!
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
iktederahmed@yahoo.com
ভাগ