কাঁকড়ায় সম্ভাবনা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে সুন্দরবনের

0

এহতেশামুল হক শাওন, খুলনা॥ রফতানি আয়ে এগিয়ে যাচ্ছে কাঁকড়া (ক্রাব)। প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েই চলেছে চাহিদা। বাগদা-গলদা চিংড়ির চাইতেও অনেক বেশি সুস্বাদু হওয়ায় এবং মর্টালিটি (মৃত্যুহার) কম থাকায় অপার সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে সমুদ্র ও সুন্দরবন সংলগ্ন ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে খামারের সংখ্যা বাড়ছে। আগে শুধুমাত্র লাইভ (জীবন্ত) কাঁকড়া রফতানি হতো। এখন সে স্থান দখল করেছে হিমায়িত সফট সেল (নরম খোলসযুক্ত) কাঁকড়া।
কোটি টাকা বিনিয়োগে শত কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বাড়ছে বিনিয়োগকারী। তবে চিংড়ির মতো কাঁকড়া পোনা (ক্রাবলেট) উৎপাদনে হ্যাচারী গড়ে ওঠেনি। ফলে পোনার জন্য খামারীদেরকে সুন্দরবনের নদী খাল ও সমুদ্র থেকে আহরণকারী জেলেদের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রাকৃতিক উৎস থেকে বেপরোয়া কাঁকড়া ধরায় সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁিকর মুখে পড়ছে বলে আশংকা বিশেষজ্ঞদের।
মৎস অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, বছর পাঁচেক আগে থেকে সফট সেল রফতানি বাড়তে থাকে। ২০১৭ সালে ১৬৪.৫৭১ মেট্রিক টন সফট সেল রফতানি করে ১৫ লাখ ৭৯ হাজার ৮০৬ মার্কিন ডলার আয় হয়। ২০১৮ সালে ৩৪৯.২৮৭ মেট্রিক টন সফট সেল রফতানি থেকে আয় হয় ৩৯ লাখ এক হাজার ৮০২ মার্কিন ডলার ও ২০১৯ সালে ৫৯৫.৮৪০ মেট্রিক টন রফতানি থেকে আয় হয় ৬৭ লাখ ৩৭ হাজার ৪১৫ মার্কিন ডলার। ২০২০ সালে করোনার কারণে রফতানিতে ব্যাঘাত ঘটে। ৩৬৪.৮৭৭মেট্রিক টন রফতানি থেকে আয় আসে ৫১ লাখ দুই হাজার ৮৪ মার্কিন ডলার। চলতি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ৯ মাসে ৪৬২.২৯৬ মেট্রিক টন সফট সেল রফতানি থেকে আয় হয়েছে ৬৪ লাখ ৯৯ হাজার ৫৮৭ মার্কিন ডলার। এশিয়ার দেশসমূহের মধ্যে চীন, তাইওয়ান, হংকং, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডে কাঁকড়া রফতানি হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত দেশসমূহ, ব্রিটেন, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া সফট সেল কাঁকড়ার বড় মার্কেট।
রফতানি আয় বাড়তে থাকার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে কাঁকড়ার খামারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি, খুলনার কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ ও বাগেরহাটের মংলা, রামপাল এলাকায় গড়ে উঠেছে কাঁকড়ার খামার। তবে সফট সেল কাঁকড়ার জন্য সাতক্ষীরা জোন বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে। অন্যস্থানে কাঁকড়া ফ্যাটেনিং করা হলেও সফট সেল খামার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্লান্ট হয়েছে শুধুমাত্র সাতক্ষীরায়। সাতক্ষীরা জেলা মৎস কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানান, এ অঞ্চলে দুটি প্রক্রিয়াজাতকরণ প্লান্ট স্থাপিত হয়েছে। হ্যাচারি রয়েছে একটি। আগামী বছর নাগাদ আরও অন্তত দুটি হ্যাচারির কার্যক্রম শুরু হবে। জেলায় কাঁকড়া চাষী রয়েছেন দুই হাজার ৩২১ জন। ৩০৭.৯০ হেক্টর জমিতে কাঁকড়া চাষ হয়, যেখান থেকে উৎপাদন হচ্ছে ২১৮৫.৭ মেট্রিক টন।
প্রাকৃতিক উৎস থেকে বেপরোয়া ক্রাবলেট আহরণের ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেন খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ে উপাচার্য প্রফেসর ড. মাহমুদ হাসান। ফিশারিজ ও মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি (এফএমআরটি) বিভাগ আয়োজিত এক ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন তিনি। ভিসি বলেন, সুন্দরবনের পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষায় কাঁকড়ার ভূমিকা রয়েছে। প্রাকৃতিক উৎস থেকে পোনা আহরণের কারণে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় এলাকার জীব বৈচিত্রের ক্ষতি হচ্ছে। হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদনের মাধ্যমে এ ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব। সুন্দরবনে কাঁকড়ার পরিমাণ নিয়ে জরিপ এবং দেশে কাঁকড়ার চাষ নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার।
মৎস বিশেষজ্ঞ ও ক্রাব গবেষক শামীম আহমেদ বলেন, হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদনের করতে অনেক সময়, শ্রম ও গবেষণার প্রয়োজন হয়। থাইল্যান্ডে হ্যাচারী সাকসেস হতে ২৩ বছর লেগেছে। ভিয়েতনামে ১৬/১৭ বছর ও ফিলিপাইনে ১৮ বছর লেগেছে। আমাদের দেশে ২০১৬ সালে প্রথম হ্যাচারী স্থাপন হয় সাতক্ষীরার শ্যামনগরে। কিন্ত সাকসেস রেট এতো কম যে কমার্শিয়ালি ভায়াবল নয়। বিশে^ ১২ মাস কাঁকড়া চাহিদা থাকে।
খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের এফএমআরটি ডিসিপ্লিনের সহযোগী অধ্যাপক মো: রাশেদুল ইসলাম দাবি করেন, হ্যাচারী সাকসেসফুল হওয়ার আগে সফট সেল রফতানির অনুমতি দেওয়া সরকারের উচিৎ হয়নি। আগে জেলেরা সুন্দরবনের খাল-নদী থেকে এবং লোকালয়ে চিংড়ি মাছের ঘের থেকে পূর্ণবয়স্ক কাঁকড়া ধরতেন। সেই কাঁকড়া বিশেষ পদ্ধতিতে ঘেরার মধ্যে রেখে খাবার খাইয়ে মোটাতাজা করে জীবন্ত রফতানি উপযোগী করতেন। এখন সফট সেলের কারণে অপূর্ণাঙ্গ কাঁকড়াও প্রচুর ধরা পড়ছে। বিশেষ পদ্ধতির ঘেরে বক্সবন্দী কাঁকড়া দুই থেকে তিনবার খোলস বদলালেই হিমায়িত করে রফতানি করা হচ্ছে। আগে প্রাকৃতিক পরিবেশে ডিম পাড়া ও বংশ বৃদ্ধির সুযোগ ছিল। এখন সেটা নষ্ট হচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে প্রকৃতিতে, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বায়ো ডাইভারসিটি।
মালয়েশিয়ার একটি পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও একোয়াকালচার এক্সপার্ট ড. এম বি মুনীর জানান, একোয়া কালচারে বাংলাদেশ বিশে^ চতুর্থ। বিশে^র সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ এরিয়া আমাদের। আমাদের চাইতে বড় সম্ভাবনা আর কারো নেই। বাংলাদেশের চাইতে মালয়েশিয়া অনেক পিছিয়ে। কিন্ত ক্রাবলেট হ্যাচারীতে তারা সাকসেস। আমাদের এখনও চেষ্টা চলছে। ওরা প্রচুর গবেষণা করে। ওরা মুনাফা করে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে। আমাদের কোন গবেষণা নাই। আমরা সর্বোচ্চ মুনাফা চাই, তাতে প্রকৃতি ধ্বংস হলেও আমাদের মাথাব্যথা নাই।
খুলনার মৎস পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো: জাহিদুল হাসান জানান, সুন্দরবন থেকে কাঁকড়া সংগ্রহকারী জেলে ও নৌকার সংখ্যা বাড়ছে। নির্বিচারে ধরা হচ্ছে ক্রাবলেট। একটা কাঁকড়া পোনা ধরার সাথে আরও অন্য প্রজাতির মাছ বা জলজ প্রাণী ধরা পড়ছে। প্রয়োজনীয়তা না থাকায় সেগুলো ফেল দিয়ে নষ্ট করা হচ্ছে। প্রকৃতিকে তার মতো করে থাকতে দিতে হয়। নাহলে প্রকৃতি এক সময় প্রতিশোধ নেয়।
সুন্দরবনের কাঁকড়া নিয়ে সুনির্দিষ্ট গবেষণালব্ধ তথ্য উপাত্ত না থাকলেও এই সম্পদ রক্ষায় বন বিভাগের রয়েছে নানা পদক্ষেপ। সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক আবু হাসান জানান, প্রজনন মৌসুম হওয়ায় জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারী দুই মাস কাঁকড়া ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। জুন থেকে আগষ্ট সব ধরনের মাছ ধরা নিষেধ। ইলিশ রক্ষায় ২২ দিন নদীতে নামা বন্ধ আছে। রাশমেলায় বন্ধ থাকবে আরো ৭ দিন। এছাড়া ১৮ টি অভয়ারণ্য এলাকায় ও ২৫ ফুটের কম প্রশস্ত খালে জেলেদের প্রবেশ নিষেধ। চাই পেতে কাঁকড়া ধরা নিষেধ। কেউ আইন অমান্য করলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তবে ভিন্নমত জানালেন কাঁকড়া জেলে আসাদুল। মুন্সিগঞ্জ ছোট বেদখালী গ্রামের আসাদুল ৩০ বছর যাবৎ সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরেন। জঙ্গলের নদী খালে আগের চাইতে কাঁকড়া বেড়েছে। আগে সারা বছর কাঁকড়া ধরতেন। এখন বছরে ছয় মাস জঙ্গল বন্ধ থাকে। তখন প্রচুর কাঁকড়ার বাচ্চা জন্ম নেয়। নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে প্রতি ট্রিপে নৌকা ভর্তি হয়ে যায় কাঁকড়ায়। আগে স্থানীয় বাজারে কম দামে বিক্রি হতো। ৪/৫ বছর খামার হয়েছে। প্রসেসিং প্লান্ট হয়েছে। সব সাইজের কাঁকড়া খামার মালিকরা ভালো দামে কিনছেন। জেলেদের আয় রোজগার বেড়েছে। করোনার কারণ যে ক্ষতি হয়েছিল তা এখন পুষিয়ে যাচ্ছে।
রফতানিমুখী সফট সেল প্রক্রিয়াজাতকরণ প্লান্টের সাথে সংশ্লিষ্ট সুত্র দাবি করছে, কাঁকড়া নিয়ে সরকারি বা বেসরকারি কোন পর্যায়েই গবেষণা নেই। সুনির্দিষ্ট তথ্য উপাত্ত নেই। ফলে যে যার মতো করে এক একটা তত্ত্ব দাঁড় করাচ্ছেন। কাঁকড়ার প্রজনন ও ডিম পাড়ার সময় হলে তারা গভীর সমুদ্রে চলে যায়। ডিম পাড়া শেষে ফিরে আসে। একটা মা কাঁকড়া একবারে ৫/৬ লাখ ডিম পাড়ে। এরমধ্যে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাচ্চা ফোটে। এখন বছরে ছয় মাস সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরা নিষিদ্ধ। এই সময়ে তারা সংখ্যায় কয়েকগুণ বাড়ে। ম্যানগ্রোভ বন ছাড়াও চিংড়ির ঘের থেকে কাঁকড়ার সরবরাহ আসে। একটা সময় কাঁকড়ার কোন চাহিদাই ছিলনা। জেলেরা ফেলে দিতো। এরপর লাইভ কাঁকড়া রফতানি শুরু হলো। এখন সফট সেলের চাহিদা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। প্রসেসিং প্লান্ট স্থাপন হওয়ায় এই জনপদে মানুষের ভাগ্য বদলে গেছে। লবনাক্ততা বৃদ্ধি, বারবার প্রাকৃতিক দূর্যোগ, ফসল হানির ঘটনায় অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল। সেই মানুষগুলো এখন খামারে সফট সেল উৎপাদন করে বিক্রি করছে। সীমাহীন দারিদ্র ছিল যাদের নিত্যসঙ্গী, তারা এখন তিনবেলা পেটপুরে ভাত খাচ্ছে। হ্যাচারী হলে প্রকৃতির ওপর চাপ কমবে। কিন্ত সেক্ষেত্রে সরকারের কোন উদ্যোগ নেই। উপরন্ত সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো নানা রকম আইন ও নীতির দোহাই দিয়ে রফতানিতে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। হ্যাচারী সাকসেসফুল করার জন্য উদ্যোগ অব্যাহত আছে। প্রাকৃতিক উৎস থেকে কাঁকড়া ধরায় তেমন কোন ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া হবেনা দাবি করে সূত্রটি জানায়, কার্যকর উদ্যোগ হবে যদি ফিমেল ক্রাব (মা কাঁকড়া) রফতানি আইন করে বন্ধ করা যায়। যদিও লাইভ ফিমেল ক্রাবের দাম আর্ন্তজাতিক বাজারে অন্যদের চাইতে দ্বিগুণ।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোটার্স এ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস হুমায়ুন কবির কাঁকড়াকে অপার সম্ভাবনাময় হিমায়িত পণ্য অভিহিত করে বলেন, আমাদেরকে এর চাষ ও রফতানি দুটোই বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রকৃতিকে বিরক্ত না করে হ্যাচারীতে সাফল্য আনতে হবে। তাহলে খামার বাড়বে, প্রসেসিং প্লান্ট বাড়বে। কাঁকড়ার মর্টালিটি (মৃত্যুহার) কম, সহ্য ক্ষমতা বেশি। চিংড়ির পাশাপাশি কাঁকড়া থেকে ধারণাতীত বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে। তার দেওয়া তথ্য মতে এ অঞ্চল থেকে তিনটি প্রতিষ্ঠান কাঁকড়া প্রসেসিংয়ের সাথে জড়িত। তারা হলো- জাপান ফাস্ট ট্রেড, ফরিদ নাইন স্টার এবং শম্পা আইস অ্যান্ড কোল্ড স্টোরেজ। মৎস অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় উপ পরিচালক মো: আবু সাঈদ বলেন, মা কাঁকড়া সংরক্ষণে আমাদের বিভিন্ন পদক্ষেপ রয়েছে। আমরা প্রকৃতি থেকে ক্রাবলেট সংগ্রহকে নিরুৎসাহিত করি এবং কেউ ধরা পড়লে তাকে শাস্তি দেই। খামারীদের চাহিদা মেটাতে শ্যামনগরে ইতিমধ্যে হ্যাচারী হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে আরও হ্যাচারী হবে। প্রকৃতিকে রক্ষা করেই আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালিত করতে হবে।

Lab Scan