করোনাভাইরাস প্রতিরোধে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল ও কেন্দ্রীয় কারাগারে ব্যাপক প্রস্তুতির দাবি

বিএম আসাদ ॥ নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল, কেন্দ্রীয় কারাগার ও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ গ্রহণ করেছে সতর্কতামূলক নানা পদক্ষেপ। কিন্তু চিকিৎসার উপকরণ সরবরাহ ও প্রতিরোধের পূর্ব প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। ভাইরাস থেকে নিরাপত্তার ব্যাপারে রয়েছে অনেক ত্রুটি। যা নিয়ে অনেকেই এ ব্যাপারে চিন্তিত রয়েছেন। এদিকে, কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিদের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। আগামীকাল শনিবার যশোর সার্কিট হাউচে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে জেলা কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হবে। সরেজমিনে জানা গেছে, (কোভিড-১৯) নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধে লোক সমাগম সীমিত করার কথা বলা হলেও যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে রোগীদের ভিড়ে চলাফেরা করার উপায় নেই। প্রায় ২ হাজার রোগী প্রতিদিন এ হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও দর্শনার্থীদের মুখে কোন মাক্স নেই। এমনকি, চিকিৎসাসেবা কাজে জড়িত সকল চিকিৎসক, সেবিকা ও কর্মচারীরা যথাযথ মাক্স ব্যবহার করছেন না। আবার কেউ হাসপাতালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কি-না তা যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগী শনাক্তের কোন ব্যবস্থা নেই। ফলে কার দেহে করোনাভাইরাস আছে কি নেই, তা চিহ্নিত করার উপায় নেই। ডাক্তার ও রোগী এক্ষেত্রে সবাই একাকার অবস্থা। এ পরিস্থিতিতে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে নেয়া হয়েছে নানামুখি পদক্ষেপ। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলীপ কুমার রায় জানিয়েছেন, নভেল করোনাভাইরাস আক্রান্তদের চিৎিসাসেবা নিশ্চিত করতে ১০টি বেড, বক্ষব্যাধি হাসপাতালে (টিবি হসপিটাল) ৪০টি বেড করা হয়েছে। প্রয়োজনে বেসরকারি নোভা হাসপাতালে ২৫টি কেবিন ও ২৫টি জেনারেল বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সব মিলে ১শ’টি বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে যশোর শহরে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে তাদের চিকিৎসার জন্য যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ২০ জন চিকিৎসক, ৩০ জন নার্স ও ১৫ জন অন্যান্য স্টাফ নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। এর ভেতর র‌্যাপিড রেসপন্স টিম ও চিকিৎসকদের নিয়ে পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামীকাল শনিবার হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে গ্যারেজটিকে নতুন টিকিট কাউন্টার হিসেবে নেয়া হবে। পৃথক কাউন্টার হিসেবে সেখান থেকে সর্দি, কাঁশি, জ্বর, গলাব্যথা, মাথা ব্যথা রোগীদের পৃথক করে বহিঃবিভাগের টিকিট সরবরাহ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য এ পর্যন্ত চিকিৎসক, সেবিকা ও কর্মচারীদের জন্য ৭৫টি সুরক্ষা পোশাক (পিপিই) রয়েছে। আরও ১শ’ ২০টি সুরক্ষা পোশাক (পিপিই) দু’একদিনের মধ্যে হাসপাতলে আনা হবে বলে তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলীপ কুমার জানিয়েছেন।
বন্দিদের সুরক্ষার ব্যাপারে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়া হলেও তা যথেষ্ট নয়। আদালত হতে কারাগারে নতুন নতুন বন্দির আগমন এবং কারাগার হতে আদালতে বন্দিদের আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত যশোরের কারা প্রশাসন। জেলার তুহিন কান্তি খান ও জেল সুপারিনটেনডেন্ট সুব্রত কুমার জানিয়েছেন, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ডেপুটি জেলার অর্ণব চৌধুরীকে প্রধান করে মোট ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে দু’জন চিকিৎসক কারা হাসপাতালের কর্মচারী রয়েছেন। তবে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসার সুরক্ষা পোশাক পিপিই নেই। তাড়াতাড়ি পাওয়া যাবে জানিয়ে ওই কর্মকর্তাগণ বলেন, কেউ আক্রান্ত হলে তাদের চিকিৎসার জন্য কারাভ্যন্তরে দুটি কক্ষবিশিস্ট বিল্ডিং রয়েছে। সেখানে কমপক্ষে ২শ’ ৫০টির মতো বেড করা যাবে। বর্তমানে বাইরে থেকে যে নতুন হাজতি আসলে তাদের জন্য বিশেষ ৩টি ওয়ার্ড রয়েছে। দু’সপ্তাহ থেকে ১৪ দিন সেখানে পর্যবেক্ষণে রাখার পর লক্ষ্মণ ভালো দেখলে ভেতরে অন্য ওয়ার্ডে পাঠানো হচ্ছে। গতকাল (১৯ মার্চ) পর্যন্ত দণ্ডপ্রাপ্ত ১শ’ ২ জন ফাঁসির আসামি, ৩৪ জন বিদেশী মিলে মোট ১ হাজার ৪শ’ ২৯ জন আসামি বন্দি ছিল বলে জানিয়ে আরও বলা হয় বন্দি আগমনের সময় ডিজিটাল থার্মোমিটার দিয়ে লক্ষ্মণ পরীক্ষা করা হচ্ছে। মাক্সের সংখ্যা কম রয়েছে। নতুন করে মাক্স তৈরি করতে দেয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে হ্যান্ডওয়াশ, সাবান ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের আরও সুরক্ষার ব্যাপারে আরও প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। তবে আদালতে হাজতে ও অন্যান্য আসামিদের আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের সংক্রমনের ব্যাপারে জেলার ও জেল সুপারিনডেন্ট চিন্তিত বলে জানিয়েছেন।
এদিকে, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সিভিল সার্জন অফিসের নেয়া পদক্ষেপ থেকে জানা গেছে, সিভিল সার্জন অফিস, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে কন্ট্রোল রুম, র‌্যাপিড রেসপন্স টিম, মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এ তিন প্রকার টিমে চিকিৎসক, সেবিকা ও কর্মচারী রয়েছেন। তবে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ পর্যাপ্ত মাক্স ও সুরক্ষা পোশাক (পিপিই) নেই। সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন জানিয়েছেন, ১শ’টি পিপিই মজুদ আছে। আরও পাওয়া যাবে জানিয়ে বলেন, জেলা, উপজেলায় আগে একশ’ করে বেড করার সিদ্ধান্ত বহাল আছে। সরকারি হাসপাতাল ও বেসরকারি হাসপাতালে এসব বেড করার সিদ্ধান্ত রয়েছে ১ম পর্যায়ে। প্রয়োজন হলে ২য় পর্যায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোন বিল্ডিং ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত যাওয়া যাবে। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে লিফলেট বিতরণ, ব্যানার, ফেস্টুন টাঙানোর মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান চলছে। সিভিল সার্জন অফিসের রোগ তত্ত্ব ও রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত ৬৭ জনকে করোনাভাইরাস সন্দেহে কোয়ারেন্টাইনে নেয়া হয়েছে। এর ভেতর ১৯ মার্চ সকাল ৮টা কোয়ারেন্টাইনে ছিল ৬৭ জন। অভয়নগরে ৮ জন, চৌগাছায় ৯ জন, যশোর সদরে ১২ জন, ঝিকরগাছায় ৯ জন, কেশবপুরে ২ জন, মনিরামপুরে ১২ জন ও শার্শা উপজেলায় ১৫ জন। ২৪ ঘন্টায় কোয়ারেন্টাইনে ঝিকরগাছায় ১ জন, কেশবপুরে ১ জন ও শার্শায় ৫ জনকে কোয়ারেন্টাইনে নেয়া হয়েছে। আগামী শনিবার বেলা ১১টায় যশোর সার্কিট হাউজে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ গঠিত জেলা কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হবে। কমিটির সদস্য সচিব ও সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ভাগ