ওই দু’টিই তো আমাদের নেই

0

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
গত ১০ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব বিভাগ ও পররাষ্ট্র দফতর বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী র‌্যাব ও এর সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তা নিয়ে দেশে তুমুল তুলকালাম কাণ্ড ঘটে চলেছে। ওই ঘটনার প্রায় সাথে সাথে সরকার এমন ভাষায় কথা বলতে শুরু করল যে, মনে হলো সরকার যেন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। বুঝে হোক বা না বুঝে হোক হুট করেই সরকার মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে কড়া কথা শুনিয়ে দিয়েছে। এর পরিণতি কী হতে পারে সে সম্পর্কে সরকারের কারো কোনো ধারণা আছে বলে মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্র ওই ঘোষণা দেয়ার পর আর তেমন কোনো কথা বলেনি, বলার প্রয়োজন বোধ করেনি। কিন্তু আমাদের মন্ত্রীরা ‘কথা’ চালিয়েই যাচ্ছেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে মন্ত্রণালয়ে তলব করার পর আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের র‌্যাব সম্পর্কিত সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রদূত নিজেও শামিল হয়েছেন। ভাগ্যিস বলেননি যে, রাষ্ট্রদূত ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। এই যা রক্ষা। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা হয়েছে। সে কথার যে বর্ণনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়েছেন তা যে অতিরঞ্জিত হবে সে ব্যাপারে বোধ হয় যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত ছিল। আর তাই তারা নিজেরা বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, আসলে কী কথা হয়েছে। র‌্যাব ও এর কর্মকর্তাদের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রধান কারণ মানবাধিকার লঙ্ঘন। নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা কর্মকর্তাদের মধ্যে র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদও রয়েছেন। তিনি এখন বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। বেনজীর আহমেদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র দফতর। একই সাথে মার্কিন রাজস্ব বিভাগও বেনজীরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এ ছাড়া র‌্যাবের বর্তমান মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, অতিরিক্ত মহাপরিচালক খান মোহাম্মদ আজাদ, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক তোফায়েল মোস্তাফা সরোয়ার, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো: জাহাঙ্গীর আলম ও সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো: আনোয়ার লতিফ খানের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে মার্কিন রাজস্ব বিভাগ। এদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর পৃথক এক ঘোষণায় বেনজীর আহমেদ এবং র‌্যাব ৭-এর সাবেক অধিনায়ক মিফতাজ উদ্দিন আহমেদের ওপর সে দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ২০১৮ সালের মে মাসে কক্সবাজারের টেকনাফে পৌর কাউন্সিলর একরামুল হককে বিচারবহিভর্‚ত হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত থাকার দায়ে এ দু’জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানানো হয়েছে। মার্কিন রাজস্ব বিভাগের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দফতর সরকারের এক নির্বাহী আদেশের আওতায় এ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এ আদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন বা দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার কথা বলা হয়েছে। এই আদেশ বলে যুক্তরাষ্ট্রে র‌্যাবও নিষিদ্ধ হয়েছে। মার্কিন রাজস্ব ও পররাষ্ট্র দফতর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব:) আজিজ আহমেদকেও যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করেছে। সেই সাথে তার মার্কিন ভিসা বাতিল করা হয়েছে। এদের কারো যদি যুক্তরাষ্ট্রে কোনো সম্পদ থেকে থাকে, তাও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মাদকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের যুদ্ধের অংশ হিসেবে র‌্যাবের যে কার্যক্রম তার বিরুদ্ধে ব্যাপক ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। এ মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ এবং বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। মার্কিন বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, র‌্যাবের বিরুদ্ধে ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬০০টির বেশি গুম, ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬০০ বিচারবহিভর্‚ত হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদন বলছে, এসব ঘটনা বিরোধী দলের সদস্য, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর ঘটানো হয়েছে। এ খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে গত ১১ ডিসেম্বর। সে দিনই এই সংবাদটির পাশে পিতার ছবি হাতে ক্রন্দনরত একটি শিশুর ছবি ছাপা হয়েছে। সেখানে গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, ‘হয় সন্ধান দিন, না হয় কবর কোথায় জানান।’ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব গুমের জন্য র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। গুম বিষয়ে সরকারের বক্তব্য ‘খুবই নিষ্ঠুর’। সরকার বলে, পারিবারিক কলহের কারণে কেউ কেউ আত্মগোপন করেন, তখন বলা হয় তাকে ‘গুম করা হয়েছে’। কিন্তু কিছু দিন পর গুম ব্যক্তি ফিরে আসে।’ সে কথা মানলে, বিশ্ব করতে হয় যে, বাংলাদেশে আসলে কেউ গুমই হয়নি। তাহলে যে ৪০ পরিবার তাদের স্বজনদের সন্ধান পেতে শাহবাগে সমবেত হয়েছিল, তারা কি নিছক নাটক করছিল?
র‌্যাব কর্তৃক গুমের মার্কিন অভিযোগের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ছয় লাখ লোক গুম হয়। এ তথ্য নতুন; কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য নয়। এ ক্ষেত্রে তিনি ক‚টনৈতিক শিষ্টাচারের ভাষাও ব্যবহার করতে পারেননি। তিনি বলেছেন, কোনো বাহিনীর সদস্যের অপরাধের জন্য গোটা বাহিনীকে দায়ী করা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ঢং। এটা অনেকটা কাচের ঘরে বসে অন্যের বাড়িতে ঢিল ছোড়ার মতো। কিন্তু আমাদের মন্ত্রীরা সেরকম ঢিল ছুড়েই যাচ্ছেন। কিছুকাল এ রকম শোরগোল তোলার পর বোধ করি সরকারের খেয়াল হয়েছে যে, ব্যাপারটা বেশি বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গেছে বা যাচ্ছে। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীকে দায়িত্ব দেয়া হলো এর একটা হিল্লা করার জন্য। তারা যেন বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলাপ-আলোচনা চালান। ইতোমধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি বিøঙ্কেনের সাথে কথা হয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনের। কিন্তু তাদের মধ্যে র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার ব্যাপারে কোনো আলোচনা হয়নি। মোমেন বলেন, ‘তিনি (বিøঙ্কেন) বললেন, জলবায়ু ইস্যুতে কাজ করবেন। গণতন্ত্রের ওপর জোর দিয়েছেন। আমি বলেছি, আমরা গণতান্ত্রিক দেশ। এরপর মানবাধিকারের ওপর জোর দিয়েছি।’ একটা সময় ছিল যখন গুম ও বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের ন্যায্যতা দেয়ার জন্য জঙ্গিবাদকে সামনে আনা হতো। ওরা জঙ্গি, এ কথা বলে খুন পর্যন্ত বৈধ ধরা হতো। এখন বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ধুয়া তোলা কমেছে। এখন এসেছে নতুন ধুয়া’ মাদক। মাদক নির্মূলে এখনো বিচারবহিভর্‚ত হত্যাকাণ্ড চলে। সরকার সে পথেই হাঁটছে বেশি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তো আর ছিন্ন করা সম্ভব নয়। দেশটির সাথে অনেক বিষয়ে আমাদের স্বার্থ জড়িত আছে’ কথা বলার সময় আমাদের সেসব দিক মনে রাখার দরকার। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে আলোচনায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ওপর জোর দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, শান্তি রক্ষা ও গণতন্ত্রসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের একসাথে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। মোমেন ব্লিঙ্কেনকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদ, মাদকপাচার, মানবপাচারসহ নানাবিধ অপরাধের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী লড়াই করছে। বাংলাদেশের যে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে তা একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। র‌্যাব যুক্তরাষ্ট্রের এই লক্ষ্যগুলোই বাংলাদেশে বাস্তবায়নে যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে; তিনি বলেছেন, জনগণের মানবাধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে র‌্যাব।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল যে বক্তব্য গণতন্ত্র ও মানবাধিকার’ যেসব বাংলাদেশ থেকে উধাও হয়ে গেছে। ভোটারবিহীন কিংবা মধ্যরাতের নির্বাচন কোনো নির্বাচনই নয়। স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে সংসদ পর্যন্ত কোথাও জনগণের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। বিরোধী দলও সরকারি নির্যাতনে কোণঠাসা। মানবাধিকার পদে পদে ভ‚লুণ্ঠিত। সেরকম একটা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দেশ আর র‌্যাব মানুষের মানবাধিকার রক্ষা করছে, এমন সাফাই কোনো কাজে আসবে না। এর আগে মার্কিন গণতন্ত্র সম্মেলনে যখন বাংলাদেশকে ডাকা হলো না তখনই সরকারের বোঝা উচিত ছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার বৈশ্বিক মিত্ররা বাংলাদেশকে মোটেও গণতান্ত্রিক দেশ মনে করে না। তখন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল গণতন্ত্রের দেশগুলোকে দাওয়াত করেছে। আগামীতে আমাদের দাওয়াত করবে। এ প্রসঙ্গে কোনো কোনো মন্ত্রী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের অবস্থা নড়বড়ে। তাদের মুখে গণতন্ত্রের ছবক মানায় না। যা হোক, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য স্ববিরোধী। যদি দুর্বল গণতন্ত্রের দেশগুলোকেই সম্মেলনে ডেকে থাকে তাহলে আগামী বছর বাংলাদেশের তথাকথিত গণতন্ত্র কি আরো দুর্বল হবে নাকি সত্যিকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কোনো পদক্ষেপ সরকার গ্রহণ করবে? আপাতত সেরকম কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ধারণা করি, তত দিনে মানবাধিকার পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটবে। মোদ্দা কথা গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা, ভিন্নমতের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সামনের দিনগুলোতে তেমন কোনো সুখবর আছে বলে মনে হয় না।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

Lab Scan