এ কেমন লকডাউন

দেশে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই সাধারণ ছুটি, সামাজিক দূরত্ব এবং লকডাউন যথাযথভাবে আরোপ বা বাস্তবাযন করা হয়নি। এর ফলে দেশে করোনা পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি হচ্ছে। প্রতিদিনই আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। গত সপ্তাহে ইনকিলাবে প্রকাশিত একটি তুলনামূলক প্রতিবেদনে দেখা যায়, করোনা টেস্টিংয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে থাকলেও সংক্রমণ, শনাক্ত ও মৃত্যুর হারে এগিয়ে। গতকাল মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় আরও ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে করোনায় মৃতের সংখ্যা ৫২২ জনে দাঁড়িয়েছে। ১ হাজার ১৬৬ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। সন্দেহভাজন রোগীদের মধ্যে সীমিত পরিসরে করোনা টেস্ট হওয়ায় প্রকৃতপক্ষে আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। ভাইরাস সংক্রমণ সারাদেশে সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার বাস্তবতায় সাধারণ ছুটি ও লকডাউনের মেয়াদ ও মাত্রা বর্ধিত করার বাস্তব উদ্যোগগুলো অকার্যকর হয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। প্রাণঘাতী ভাইরাসের একটি বৈশ্বিক মহামারীর সময় সারাবিশ্ব যখন লকডাউন, কারফিউর মত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলা করছে, বাংলাদেশে তখন শৈথিল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমন ঢিলেঢালা লকডাউনের মাধ্যমে যে করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, তা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে গেছে।
এ বছরের জানুয়ারি-ফেব্রæয়ারি থেকে ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে কড়াকড়ি লকডাউন চলছে। লাখ লাখ সংক্রমণ ও হাজার হাজার মৃত্যুর তীব্রতা এখন কিছুটা কমে আসলেও, লকডাউন খুলে সবকিছু শুরু করতে বিশেষ সর্তকতাসহ ধীরে চল নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে। আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার ক্রমাগত বৃদ্ধির মধ্য দিয়েই প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে আসছে। গতকাল ইনকিলাবে প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়, দেশে সাধারণ ছুটি ও লকডাউনের মধ্যেও রাজধানীর কিছু রাস্তায় যানজটের চিরায়ত চিত্র ফিরে এসেছে। এপ্রিল মাসে হাজার হাজার গার্মেন্ট কর্মীকে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের কারখানাগুলোতে একাধিকবার তলব করে হাজির করার কারণে সামাজিক সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। সংক্রমণের হার বৃদ্ধির মধ্যেও ঈদকে সামনে রেখে কিছু মার্কেট ও শপিংমল খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যদিও অনেক মার্কেট ও শপিংমলের কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বিবেচনা করে বন্ধ রেখেছে, তারপরও যেসব মার্কেট খোলা হয়েছে সেখানে মানুষ অসচেতন হয়ে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে ভিড় করে শপিং করছে। এর পরিণাম কি, তা বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। এর মধ্যেই ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার জন্য লকডাউনের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন উপায়ে ঢাকা ছেড়ে, সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এর পরিণতিও কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা পরবর্তীতে দেখা গেলেও দেখা যেতে পারে।
মানুষের জীবন বাঁচাতে হবে। সেই সাথে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের উৎসগুলোকেও রক্ষা করতে হবে। তবে এমন একটি বৈশ্বিক মহামারীতে যখন সারাবিশ্বের অর্থনৈতিক কর্মকাÐে লকডাউন চলছে, তখন ব্যাপক সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে লকডাউন শিথিল করা এবং এর মাধ্যমে দেশকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে কিনা তা সংশ্লিষ্টদের ভাবতে হবে। দেশে ক্রমবর্ধমান হারে বেড়ে চলেছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার। প্রতিবিধানহীন ও প্রতিকারহীন প্রাণঘাতী ভাইরাস সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ ও সীমিত রাখার একমাত্র পন্থা হচ্ছে মানুষের চলাচল বন্ধ করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নির্দেশাবলী পালন নিশ্চিত করা। দেখা যাচ্ছে, করোনা মহামারী মোকাবেলায় বারবার সাধারণ ছুটির মেয়াদ বর্ধিতকরণসহ হাজার হাজার কোটি টাকার ত্রাণ তহবিল, প্রায় লক্ষকোটি টাকার প্রণোদনা-উদ্ধার তহবিল কোনো কাজে আসছে না। মানুষ স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফলে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে। পরিস্থিতি দেখে মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, এ ধরনের লকডাউন থাকা না থাকা সমান কথা। এ পরিস্থিতি চলতে পারে না। আমরা মনে করি, রাজধানীতে প্রবেশ এবং এ থেকে বের হওয়াসহ রাস্তা-ঘাটে মানুষের চলাচল বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। যতদিন লকডাউন থাকবে, এ সময়ের মধ্যে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে।

ভাগ