একুশের চেতনা ও করণীয়

নার্গিস বেগম
২১শে ফেব্রুয়ারি। মহান শহীদ দিবস। একই সাথে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। জাতি যথাযোগ্য মর্যাদায় আবেগাপ্লুত হৃদয়ে মহান শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে শ্রদ্ধাবনত হবে। গণমাধ্যমে, সভা-সেমিনারে একুশের চেতনার কথা সাড়ম্বরে উচ্চারিত হবে। কি সেই চেতনা ? একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। আমি তখন সবেমাত্র স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ছাত্রী। কলেজ থেকে একুশের শহীদদের স্মরণে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে আয়োজিত মিছিলে অংশ নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে বাড়ি ফিরেছি। স্লোগানে স্লোগানে শহর প্রকম্পিত। অনেক স্লোগানের মধ্যে একটি ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। স্লোগানটি আমার তৎকালীন সীমিত জ্ঞানে অপ্রাসঙ্গিক মনে হওয়াতে আব্বাকে খানিক বিরক্তি নিয়েই প্রশ্ন করেছিলাম- ‘শহীদ দিবসে এ স্লোগান কেন ? এটা কি বোকামি নয় ? আব্বা সেদিন বুঝিয়েছিলেন, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠা করা শুধু নয়, আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান, খাদ্যসহ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সকল দাবি বাস্তবায়ন করতে হলে স্বায়ত্তশাসন অর্থাৎ নিজের বিষয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নেবার স্বাধীনতা প্রয়োজন। সেজন্যেই স্বায়ত্তশাসনের দাবি।
ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেই কিন্তু সেদিন আন্দোলন থেমে যায়নি। ধারাবাহিক আন্দোলনের রক্তাক্ত পথ বেয়ে স্বায়ত্তশাসন নয়, অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। পাকিস্তানের একাংশ পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ নাম নিয়ে স্বাধীন দেশ হিসাবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।
সংগ্রামী জনতা, নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে স্বজন, সম্পদ হারানো কোটি কোটি মানুষ উজ্জীবিত হয়ে উঠলো লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের আশায়। কিন্তু স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় অচিরেই দেশবাসী মুহ্যমান হয়ে পড়লো। যে বীর যুবকের দেশ মাতৃকার মুক্তির লক্ষ্যে জীবন তুচ্ছ করে অস্ত্র হাতে শত্রু নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাদের অধঃপতন, পথভ্রষ্টতা বিস্মিত, সাথে সাথে শঙ্কিত করে তুললো দেশবাসীকে। নব্য স্বাধীন দেশে শহীদ মিনার ‘বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবাঞ্ছিত কর্মকাণ্ডে কলঙ্কিত হল। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধায় দেশ ভরে গেল। শব্দ ভাণ্ডারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নামে নতুন শব্দ সংযোজিত হল। জন্ম নিল নতুন ‘বাদ’। যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এত লড়াই সেই গণতন্ত্র নিহত হল নব্য আমদানিকৃত বাক্শালের নিষ্পেষণে। ভিন্ন মতের প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ নিখোঁজ হয়ে গেল। যত্রতত্র লাশ আর লাশ। খাদ্যের জন্য কুকুরে মানুষে লড়াই। বস্ত্রহীনের লজ্জা ঢাকবার একমাত্র উপায় রাতের আঁধার। এই ঘোর অমানিশা কাটাতে ঐক্যবদ্ধ হল সিপাহী জনতা। পরিবর্তন এল রাজনীতিতে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশবাসীর স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় নিশ্চিত হল। প্রতিষ্ঠিত হল বহুদলীয় গণতন্ত্র। কিন্তু আবারও ষড়যন্ত্র। দেশি-বিদেশি চক্রান্তে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের নায়ক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলেন। জেঁকে বসলো সামরিক শাসন। দীর্ঘ নয় বছর আপোষহীন লড়াই করে শহীদ জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরী বেগম খালেদা জিয়া সামরিক জান্তার সরকারকে উৎখাত করেন সংগ্রামী জনতাকে সাথে নিয়ে। একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল গণরায়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী দল বিজয়ী হয়। সরকার গঠন করে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে গণতন্ত্রের পথ চলাকে সুগম করতে সচেষ্ট হন তিনি। কিন্তু থেমে থাকেনি চক্রান্ত। নব্য বাকশালীরা প্রতিজ্ঞা করলেন, একদিনও শান্তিতে থাকতে দেবেন না। তাই হল। সরকারের উদারতা ও সহিষ্ণুতার সুযোগ নিয়ে সমগ্র দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগ। ১৭৬ দিন হরতাল করে দেশ অচল করে দেয় আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দেশের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করলেন। আওয়ামী লীগ সে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সেই নির্বাচনের মাধ্যমে সৃষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচিত হয়ে ১৯৯৬তে সরকার গঠন করেছে। একই ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচিত হয়ে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হয় পুনরায়। ২০০৭ সালের নির্ধারিত নির্বাচনের পূর্বে পুনরায় অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টি করে সেনা সমর্থিত অগণতান্ত্রিক সরকারকে স্বাগত জানায়। গণতন্ত্র আবারও অন্ধকারে নিমজ্জিত হল। দু’বছর রাজনীতি নিষিদ্ধ এবং রাজনীতিবিদরা নিগৃহীত, নির্যাতিত, অপদস্ত হলেন। ২০০৮ এ জনদাবির মুখে ফখরুদ্দীন-মঈনউদ্দীন-এর সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু তাদের স্বাগত জানানোর জন্য কৃতজ্ঞতাবোধ ও গত দু’বছরের অপকর্মের দায়মুক্তির নিশ্চয়তার বিনিময়ে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী করতে সমস্ত প্রশাসনকে ব্যবহার করে। সে নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া ডাক দিয়েছিলেন ‘দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’। কিন্তু শেখ হাসিনা দশ টাকা সের চাল এবং ঘরে ঘরে চাকরি দেবার চটকদার প্রতিশ্রুতিতে দেশবাসী বিভ্রান্ত হয়েছিল। দেশবাসীর ভ্রান্তি এবং মঈন-ফকরুদ্দীন-এর অবৈধ সরকারের সহায়তায় শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হলেন। তারপর থেকে দশ বছর চলছে তার শাসন। ২০১৪তে ভোটারবিহীন নির্বাচনে ১৫৪ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়ে নতুন ইতিহাস গড়লেন। ২০১৮তে একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। নির্বাচনের নির্দিষ্ট দিনের পূর্ব রাত্রিতেই প্রশাসনের সাহায্যে ব্যালটবাক্স ভর্তি করে ফেলা হল। বিরোধী দলীয় প্রার্থীদের এবং তার কর্মীদের ভোট কেন্দ্রের ধারে কাছেও ঘেঁষতে দেওয়া হল না। এভাবে আবারও জঘন্য পন্থায় শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হলেন। এই নির্লজ্জ এমপিগণ নিজেদের জনপ্রতিনিধি হিসাবে দাবি করে সংসদ আলো করে বসে আছেন। আবার শুরু হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভাঙা রেকর্ডের বাজনা।
এই চেতনার ফেরিওয়ালারা আজ সারাদেশে প্রেতনৃত্য করছে। ভাষা শহীদদের চেতনায় যে মুক্তবাকের স্বপ্ন ছিল, পরবর্তীতে যা স্বায়ত্তশাসনের দাবির মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে পরিণত হয় সে স্বপ্ন আজ ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে। একুশের শিক্ষা হচ্ছে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াবার শিক্ষা। ন্যায্য দাবির পক্ষে জোরালো কন্ঠে আওয়াজ তোলা। অন্যায়ের প্রতিবাদে দুষ্ট দমনে সাহসী ভূমিকা নেওয়া। আজ সেই শিরদাঁড়া ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। যুগে যুগে যে যুবশক্তি জীর্ণ পুরাতনকে হটিয়ে নতুনকে আহ্বান করেছে সে শক্তি আজ হীনবল, নিবীর্য। ভীরু, নিরুদ্যম। যে স্বাধীনতার জন্য দামাল ছেলেরা জীবনবাজি রেখেছিল সে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব আজ অন্যের অঙ্গুলি হেলনে নিয়ন্ত্রিত। একটি নতজানু, পুতুল সরকার নিজ স্বার্থে সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু জাতি আজ প্রতিক্রিয়াহীন। রুদ্ধ গণতন্ত্র, পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন ব্যবস্থা, বিধ্বস্ত অর্থনীতি, ধ্বংসপ্রাপ্ত, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, ভয়ঙ্কর নিরাপত্তাহীনতা, অকার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, শিশু ও নারীর প্রতি সীমাহীন সহিংসতা কোন কিছুই যেন জাতির মরণ ঘুমকে বিঘিœত করতে পারছে না।
একুশের চেতনা, শিক্ষা তো এটি নয়। তাহলে কেন এই নিষ্ক্রিয়তা ? আমরা কি নতুন করে অন্য কারো শৃঙ্খলাকে কন্ঠে ধারণ করবো ? সিকিম ও সম্প্রতি কাশ্মিরী জনগণের ভাগ্য কি আমাদের শঙ্কিত করে না ? যে গণতন্ত্রের জন্য সেই ১৯৪৭ থেকে এদেশের মানুষ ধারবাহিকভাবে নিরন্তর সংগ্রাম করেছে সেই গণতন্ত্র আজ শৃঙ্খলাবদ্ধ। কণ্ঠরোধ করে আছে নিবর্তনমূলক আইন। জঙ্গীবাদের জুজুর ভয় দেখিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা হচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতার ধুয়া তুলে সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বিভাজন সৃষ্টি করা হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে যুবশক্তিকে মাদক এবং লোভের গহ্বরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ভিন্ন মতের কারণে জীবনাশংকা দেখা দিচ্ছে। এ সবই একুশের শিক্ষা ও আদর্শের বিপরীত। এই ফেব্রুয়ারিতে শপথ নিতে হবে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার। এ লক্ষ্যে প্রয়োজন খালেদা জিয়ার মুক্তি। তিনি মুক্ত হলে গণতন্ত্র মুক্ত হবে। দেশ বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে। শপথ হোক মাথা উঁচু করে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াবার।
ভাগ