একটি কফিনের পাশে ঢাকা

লোকসমাজ ডেস্ক ॥ দেশ স্বাধীন করতে ছাত্র অবস্থায়ই যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। হয়ে উঠেছিলেন গেরিলা যোদ্ধা। স্বাধীন দেশে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে তিন বার সংসদ সদস্য আর দুই বার মন্ত্রী হন। ছিলেন অবিভক্ত ঢাকার শেষ মেয়র। রাজনীতির মাঠে আপন পর ভুলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার নেতা। সব মানুষের খোকা ভাই। আর তাইতো ঢাকায় জন্ম নেয়া, বেড়ে উঠা সাদেক হোসেন খোকার কফিনের পাশে দাঁড়িয়েছে পুরো ঢাকা। লাখো মানুষের শোক আর শ্রদ্ধায় গতকাল সমাহিত করা হয়েছে ঢাকাবাসীর এই প্রিয় নেতাকে।  চার দফা জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে জুরাইন কবরস্থানে মায়ের কবরে সমাহিত করা তাকে। জানাজা আর শ্রদ্ধা নিবেদনের অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন নানা শ্রেণি পেশার মানুষ। দল মতের ঊর্ধে উঠে খোকার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন লাখো মানুষ। প্রিয় নেতার শেষ বিদায়ে অশ্রুভেজা ছিল নেতাকর্মীদের চোখ। তার কফিনবাহী গাড়ি ঘিরে বিলাপ করেছেন অনেক নেতাকর্মী। সাবেক হোসেন খোকার সংসদীয় আসনের এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষকে দেখা গেছে খোকার শেষ যাত্রায়। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক সহকর্মীরাও।
সংসদ ভবনে জানাজা, শ্রদ্ধা: গতকাল সকাল সাড়ে আটটায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছালে সেখান থেকে সরাসরি সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নিয়ে আসা হয় সাদেক হোসেন খোকার মরদেহ। সেখানে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জানাজা। জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। সাদেক হোসেন খোকার দুই ছেলে ইশরাক হোসেন ও ইসফাক হোসেন ছাড়াও সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর আলম রাঙ্গা, জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ প্রমুখ জানাজায় অংশ নেন। সেখানে বিভিন্ন রাজনেতিক দলের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
শহীদ মিনারে সর্বসাধারনের শ্রদ্ধা: সংসদ ভবনে জানাজা শেষে সর্ব সাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বেলা ১২ টায় খোকার মরদেহ নেয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। খোকাকে শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সাদেক হোসেন খোকাকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাসদ নেতা খালেকুজ্জামান, গণফোরাম থেকে আবু সাইয়িদ, সুব্রত চৌধুরী, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দল, মনোবিজ্ঞান বিভাগ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ফকির আলমগীর, জাতীয় হিন্দু মহাজোট, এলডিপি মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ভাসানী অনুসারী পরিষদ, ন্যাপ, ডাকসুর সহসভাপতি নুরুল হক নুর, ছাত্রদল, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির নেতারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
নগর ভবনে শ্রদ্ধা: অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকার মরদেহ নেয়া হয় তার প্রিয় কর্মস্থল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ভবন প্রাঙ্গনে। মরদেহ আনার পর (বর্তমান) ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশের অনেক কর্মকর্তা কর্মচারী কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। বেলা ৩ টায় ডিএসসিসি নগর ভবন প্রাঙ্গনে খোকার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকনসহ করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষ অংশ নেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি (খোকা) দল মত নির্বিশেষে মানুষের জন্য সেবা করে গেছেন, এটাই ছিল তার আদর্শ। আমরা খোকার আদর্শ মেনে চলব। তিনি বলেন, অবিভক্ত ঢাকার শেষ নির্বাচিত মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা আমাদের মাঝে নেই। তার মৃত্যুতে ঢাকাসহ সারা দেশবাসী শোক প্রকাশ করেছে। তিনি তার জীবদ্দশায় এ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে নগরবাসীর সেবা করে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে মুক্তিসংগ্রামে তিনি অসামান্য ভূমিকা রেখে গেছেন। আমরা মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে দোয়া করি যেন তার ভূল ত্রুটি ক্ষমা করে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন।
নয়াপল্টনে লাখো নেতাকর্মীর ঢল: শহীদ মিনারে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা শেষে দুপুর সোয়া একটায় নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সামনে নিয়ে আসা হয় খোকার মরদেহ। বাদ জোহর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে তার জানাজা সম্পন্ন হয়। এ সময় জানাজায় অংশ নিতে লাখো নেতাকর্মীর ঢল নামে। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নেতাকর্মীরা ছুটে যান নয়া পল্টনে। নেতাকর্মীদের ভিড়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কটি বন্ধ হয়ে যায় দুপুরের পর থেকে। জানাজার আগে নাইটিঙ্গেল মোড় থেকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত পুরো সড়ক ছিল লোকে লোকারণ্য।
নয়াপল্টনে খোকার মরদেহ নিয়ে এলে প্রথমে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রয়াত নেতার কফিনটি দলীয় পতাকা দিয়ে মুড়িয়ে দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর দলের পক্ষ থেকে কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। কালো কাপড়ে মোড়া অস্থায়ী মঞ্চে রাখা হয় খোকার কফিন। নেতা-কর্মীদের কফিনের সামনে কাঁদতে দেখা যায়। বিএনপি মহাসচিবসহ নেতারাও ছিলেন অশ্রুসজল। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের সকলের প্রিয় নেতা, মুক্তিযোদ্ধা, দুই বারের নির্বাচিত ঢাকার সাবেক মেয়র, সাবেক মন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য, ঢাকা মহানগরের সাবেক সভাপতি সাদেক হোসেন খোকা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। এমন এক সময় চলে গেলেন যখন আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে। তিনি তাকে শেষ দেখা দেখতে পারলেন না। আজকে এই ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্যাতনে সারা বাংলাদেশের মানুষ যখন অত্যাচারিত, লাঞ্চিত, সেই সময়ে যে মানুষগুলো ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল সাদেক হোসেন খোকা তার অন্যতম। তিনি চলে গেছেন। তার বর্ণাঢ্য রাজনীতির কথা বলার সময় নয়। তিনি বলেন, সাদেক হোসেন খোকার এই অকালে চলে যাওয়ায় যে রাজনৈতিক শূণ্যতা সৃষ্টি হলো তা পূরণ হওয়ার নয়। আল্লাহ তালার কাছে দোয়া করি তিনি যেন তার সকল গুনাহ মাফ করে দেন, তাকে বেহেশত নসিব করেন। কার্যালয়ের সামনে খোকার জানাজায় ইমামতি করেন, উলামা দলের আহ্‌বায়ক মাওলানা শাহ নেছারুল হক। এরপর তার কফিনে স্যালুট জানান সেক্টর কমান্ডার শাহজাহান ওমরের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল।
বাবার জানাজায় যা বললেন ইশরাক: দেশে আনার পর পর চারটি জানাজা হয় সাদেক হোসেন খোকার। সবকটিতেই জানাজার আগে বাবার স্মৃতিচারণ ও বাবার জন্য দোয়া চেয়েছেন বড় ছেলে ইশরাক হোসেন। সংসদ ভবনের জানাজায় ইশরাক বলেন, প্রায় সময়ই আব্বু বলতেন, যেই বাংলাদেশ নিজ হাতে স্বাধীন করেছি, সেই দেশে আমাকে কি বাক্সবন্দি হয়ে ফিরতে হবে? শেষ পর্যন্ত বাবার কথাই সত্যি হলো। তাকে দেশে আনা হলো, তবে সুস্থ অবস্থায় নয়, একেবারে কফিনে মুড়িয়ে বাক্সবন্দি করে। এ কথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন খোকার বড় ছেলে ইশরাক।
পরে শহীদ মিনারে সর্বসাধারণের সামনে ইশরাক হোসেন বলেন, তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হয়ে কিছু বলতে চাই। বাংলাদেশে প্রতিহিংসার যে রাজনীতি চর্চা, তার ভুক্তভোগী আমার বাবা, আমার পরিবার। বাবার সঙ্গে গত পাঁচ বছর কাটিয়েছি। অনেক কিছু শিখেছি। তিনি বলতেন, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। এখানে আজকে যে হানাহানির রাজনীতি চলছে, এর জন্য বাবা মুক্তিযুদ্ধ করেননি। রাজনৈতিক ভিন্নমত থাকবে, বহু রাজনৈতিক দল থাকবে, আমাদের লড়াই হবে ভোটের মাধ্যমে।
ইশরাক বলেন, আজকে যে পর্যায়ে পৌঁছেছি, বিএনপির যারা আহত, নিহত ও অত্যাচারের শিকার হয়েছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই, এই রাজনীতির চর্চা কত দিন চলবে? বাংলাদেশে দুজন অভিভাবক আছেন, একজন খালেদা জিয়া, যিনি জেলে আছেন। আরেকজন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমি প্রশ্ন রাখতে চাই, আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায়? আপানারা এর সমাধান করে দেন?
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে ইশরাক বলেন, খালেদা জিয়ার জামিনের যে বাধাগুলো আছে, সেগুলো দূর করেন। আশপাশের স্বার্থবাদীদের বাদ দিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দিয়ে যান। আমরা যারা নতুন প্রজন্ম, তারা চাই না আর কোনো বিএনপি পরিবার এই প্রতিহিংসার রাজনীতির শিকার হোক এবং অন্য কোনো দল যদি ক্ষমতায় আসে, তখন আওয়ামী লীগের কোনো পরিবার প্রতিহিংসার শিকার হোক। আমাদের অভিভাবক যারা আছেন, তাদের এর সমাধান করে দিয়ে যেতে হবে। অন্য কারও দিয়ে এটা হবে না। যারা বাবাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বাবার জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।
সোমবার বেলা ১টা ৫০ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান খোকা। ক্যান্সারে আক্রান্ত খোকা প্রায় পাঁচ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। সাদেক হোসেন খোকার জন্ম ১৯৫২ সালের ১২ই মে। ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আশির দশকে বামপন্থি রাজনীতি ছেড়ে আসেন বিএনপিতে। ওই সময় নয়াবাজার নবাব ইউসুফ মার্কেটে বিএনপির কার্যালয় থেকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সূচনা করে সাতদলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ওই অন্দোলনে ঢাকা মহানগর সংগ্রাম পরিষদের আহ্‌বায়কের দায়িত্ব পেয়েছিলেন খোকা।
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসনে (সূত্রাপুর-কোতোয়ালি) শেখ হাসিনাকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসেন। এসময় তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ঢাকার আটটি আসনের মধ্যে সাতটিতে বিএনপি প্রার্থী পরাজিত হলেও একমাত্র খোকা নির্বাচিত হন।
২০০১ সালের নির্বাচনেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মৎস্য ও পশুসম্পদমন্ত্রী হন। ২০০২ সালের ২৫শে এপ্রিল অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১১ সালের ২৯শে নভেম্বর পর্যন্ত তিনি ঢাকার মেয়র ছিলেন।

ভাগ