এইচএসসিতে পরীক্ষার্থীর অনুপস্থিতির হার ভাবাচ্ছে যশোর শিক্ষা বোর্ডকে

0

তহীদ মনি॥ ২০২১ সালের এইচএসসিতে পরীক্ষার্থীর অনুপস্থিতির সংখ্যায় আশাহত হয়েছে মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড যশোর। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অনুপস্থিতির এ হারকে আশংকাজনক বলে উল্লেখ করেছেন স্বয়ং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষের ধারণা ছিল পরীক্ষা গ্রহণের বিষয় ও উত্তীর্ণ নম্বর কম থাকায় পরীক্ষার্থীরা উৎসাহের সাথে অংশ গ্রহণ করবে। তাছাড়া ২০২০ সালে করোনার কারণে এইচএসসি পরীক্ষা বন্ধ থাকার পর ২০২১ এ পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের উজ্জীবিত করবে। কিন্তু তারা বিস্ময়ের সাথে দেখলেন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে পরীক্ষার্থীর অনুপস্থিতির সংখ্যা বেশি।
শিক্ষক ও পরীক্ষার্থীরা এর জন্যে করোনা ও তৎপরবর্তী অবস্থায় দীর্ঘদিন ক্লাস ও পরীক্ষা না হওয়া, ছাত্রীদের বিয়ে হয়ে যাওয়া, পরিবারের প্রয়োজনে কর্মে জড়িয়ে পড়াসহ অর্থনৈতিক সমস্যাকে দায়ী করেছেন।
২০২১ সালের ১ ডিসেম্বর উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়। পরীক্ষা শেষ হয় ৩১ ডিসেম্বর। এক মাসব্যাপী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের প্রত্যেককে ৩টি বিষয়ে অর্থাৎ ৬টি পরীক্ষা দিতে হয়। ৬টি পত্রে প্রতিটিতে ৫০ নম্বরের পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষার সময়ও ৩ ঘন্টা থেকে কমিয়ে আনা হয়। ৩টি বিষয়ে ৬টি পত্রে ৫০ নম্বর হিসেবে পরীক্ষা দিলেও পরীক্ষার্থীরা সব বিষয়ে পরীক্ষা দিয়েছে বলে ধরে নিয়ে পূর্ণ নম্বর ভিত্তিতে ফলাফল পাবে, এমন ছিল নিয়ম। আগামী সপ্তাহখানেকের মধ্যে ওই পরীক্ষঅর ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বোর্ড সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মধাব চন্দ্র রুদ্র বলেন, এত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষায় যশোর শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থীর অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
তিনি জানান, সদ্য সমাপ্ত এইচএসসি পরীক্ষায় ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৪১ পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে ১৯ হাজার ৩৪১ জন, বাণিজ্য বিভাগে ১৭ হাজার ৬০২ জন এবং মানবিক বিভাগে ৯৪ হাজার ২১৬ জন। ২২৭টি কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এ পরীক্ষায় প্রতিটি বিষয়ের পরীক্ষা ৩শ থেকে এক হাজার ও ৬ শতাধিক পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। অনেকে ছিল আবার একটি বিষয়ের একপত্রে পরীক্ষায় অংশ নিলেও অন্যপত্রে অংশ নেয়নি। অনেকে দুইটি বা তিনটি পরীক্ষীয় অনুপস্থিত ছিল। এসব নানা জটিলতায় শিক্ষাবোর্ড পূর্ণাঙ্গ অনুপস্থিতির তথ্য জানাতে না পারলেও বিষয় প্রতি অনুপস্থির তথ্য দিয়েছে। তথ্য মতে, সর্বোচ্চ অনুপস্থিতি পাওয়া গেছে পৌরনীতি ও ইতিহাসে। এ দুটি বিষয়ের ৪টি পত্রে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬৫৯ জনের অনুপস্থিতির তথ্য রয়েছে। তাছাড়া পদার্থ, রসায়ন, গণিত বা জীব বিজ্ঞানের প্রতিদিনই ৩ শতাধিকের বেশি পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। যুক্তিবিদ্যা, হিসাব বিজ্ঞান এবং অর্থনীতিতে প্রতিদিনই সর্বনিম্ন ৩১৬ থেকে সর্বোচ্চ ৪৮৩ জন পর্যন্ত অনুপস্থিত ছিল। একই চিত্র অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রেও।
ব্যাপক সংখ্যক এ অনুপস্থিতির বিষয় নিয়ে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটি কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছে। উল্লেখযোগ্য কারণ না পেলেও কিছু কিছু সমস্যা তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
এ বিষয়ে যশোরের বাঘারপাড়া ্উপজেলার নারিকেলবাড়িয়া কলেজের অধ্যক্ষ মিহির কুমার সাহা বলেন, এবারে পরীক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি বেশি ছিল। একেতো ২০২০ সালে পরীক্ষা হয়নি, অটোপাস ছিল। ২০২১ এ এপ্রিলে যে পরীক্ষা হওয়ার কথা তা অনুষ্ঠিত হয় বছর শেষে ডিসেম্বরে। দীর্ঘদিন পরীক্ষা হয়নি, ক্লাসও ঠিকমতো হয়নি, অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার আশা ছেড়েই দিয়েছে। তাছাড়া অনেক ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে।
বাগেরহাটের রামপাল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ রেবেকা সুলতানাও একই রকম কথা বলেন। তিনি আরও জানান, করোনা পরবর্তী সময়ে অনেক পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের অনেকেই কর্মমুখী জীবন বেছে নিয়েছে। তাছাড়া ক্লাস ঠিকমত পায়নি, অনেকে প্রাইভেট টিচারের কাছে পড়তে পারেনি, বিধায় ফলাফল ভালো হবে না মনে করে পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।
কুষ্টিয়া সরকারি আমলা কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম সরকার ড্রপআউটকে অন্যান্য কারণের সাথে দীর্ঘদিন পরীক্ষা না হওয়া, হতাশা ও অনির্দিষ্টতার কারণও উল্লেখ করেন। আরও কয়েকজন অধ্যক্ষ ও কলেজ শিক্ষক এসব বিষয়কে পরীক্ষার্থীর অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মাধব চন্দ্র রুদ্র আরও বলেন, ২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীর এ অনুপস্থিতির হার আশঙ্কাজনক। এটা ঠিক মহামারি করোনার কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল, ২০২০ সালে পরীক্ষা নেয়া সম্ভব না হওয়ায় সরকারি সিদ্ধান্তে অটোপাস দেওয়া হয় এবং ২০২১ এর পরীক্ষাও বিলম্বে এসে ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়। তবে দীর্ঘদিন ক্লাস পরীক্ষা না থাকায় বোর্ড কর্তৃপক্ষ ধারণা করেছিল পরীক্ষার্থীরা উৎসাহ ও আগ্রহের সাথে পরীক্ষায় অংশ নেবে। তাছাড়া মাত্র ৩টি বিষয়ে, সংক্ষিপ্ত সিলেবাসেও ৫০ নম্বরের পরীক্ষা, ফলে পরীক্ষার্থীর অংশগ্রহণ যতটা আশা করা হয়েছিল, উপস্থিতি সেভাবে হয়নি।
তিনি বলেন, অনেক শিক্ষক-অভিভাবকের কাছে তিনিও শুনেছেন মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়া, অনেকের কর্মক্ষেত্রে যোগদানসহ পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে এবারের পরীক্ষায় উপস্থিতি হার যথেষ্ট ছিল না। তবে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ আশা করে ২০২২ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় এ সমস্যা থেকে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বেরিয়ে আসতে পারবেন।

Lab Scan