ঈদে ঘরে ফেরা: ট্রেন-লঞ্চে ঠাঁই নেই সড়কে যানজট

ঈদ মানেই অনাবিল আনন্দ। ঈদ মানেই খুশি। আনন্দ-খুশির ঈদ পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিতে নাড়ির টানে ছুটছে মানুষ। ‘তিল ধারণের ঠাঁই নেই’ বিভিন্ন রুটের ট্রেন ও লঞ্চে। আর সড়কপথে ছিল তীব্র যানজট। পথে পথে ছিল চরম ভোগান্তি ও দুর্ভোগ। কিন্তু কোনো বাধাই আটকাতে পারেনি রাজধানী থেকে ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা। শুক্রবার সড়ক, রেল ও নৌপথে সরেজমিন ঘুরে পাওয়া গেছে দুর্ভোগের এমন চিত্র।
দেখা গেছে, নড়বড়ে রেলপথ ও ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি যাত্রী নিয়ে চলায় ট্রেনের গতি ছিল বেশ কম। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল বঙ্গবন্ধু সেতুর পাশে সুন্দরবন এক্সপ্রেসের লাইনচ্যুতির ঘটনা। এতে পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথ বন্ধ ছিল প্রায় আড়াই ঘণ্টা। সব মিলিয়ে এদিন ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় ছিল চরমে। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সব রুটের ট্রেনই বিলম্বে ছেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীরা। কারণ এ রুটের ট্রেন দেড় থেকে আট ঘণ্টা বিলম্বে ছেড়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে লোকে লোকারণ্য ছিল কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন। প্রায় একই ধরনের চিত্র ছিল সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। কারণ অধিকাংশ রুটেই নির্ধারিত সময়ে লঞ্চ ছাড়েনি।
আর সড়কপথে ভোগান্তি ছিল অসহনীয়। বঙ্গবন্ধু সেতুর উভয় পাড়ে সৃষ্টি হয়েছিল প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট। এ ছাড়া নদীতে স্রোতের কারণে বিভিন্ন ঘাটে ফেরি চলাচল বিঘ্নিত হয়েছে। এতে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া, কাঁঠালিয়া-শিমুলিয়া ঘাটের দু’পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে বিভিন্ন রুটের যানবাহনের। এতে দু’পাশের সড়কেই বড় ধরনের যানজটের সৃষ্টি হয়। শুক্রবার রাজধানীর কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন ঘুরে দেখা যায়, স্টেশন, স্টেশন চত্বর লোকে লোকারণ্য। এদিন ভোর থেকেই ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে। দুপুর ২টার দিকে টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব পাড়ে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের তিনটি কোচ লাইনচ্যুত হয়। আড়াই ঘণ্টা পর লাইনচ্যুত কোচ উদ্ধার শেষে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হলেও ততক্ষণে বিভিন্ন ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় আরও চরমে ওঠে।
গত ৩১ জুলাই ১৮-২০ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে যারা ৯ আগস্টের টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন তারাই শুক্রবার কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। বিলম্বে আসা এক একটি ট্রেন কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছতেই হুড়াহুড়ি করে ট্রেনে উঠতে দেখা গেছে যাত্রীদের। জানানা দিয়েও লোকজন উঠছিল। ট্রেনের ইঞ্জিন, ছাদ ও দুই কোচের সংযোগস্থলেও ঘরমুখো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উঠছিল। কমলাপুর রেলস্টেশনে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মোহাম্মদপুরের আবুল হোসেন। তিনি জানান, তার পরিবারের ৬ সদস্য নিয়ে ভোর ৫টায় কমলাপুর স্টেশনে আসেন। ট্রেনটি ভোর ৬টা ২০ মিনিটে ছাড়ার কথা থাকলেও এখন (সকাল সাড়ে ৯টা) পর্যন্ত ট্রেনটি ছাড়েনি। অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বললেন, ১৫-১৬ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিলম্বে ট্রেন আসছে-ছাড়ছে, দায়িত্বশীলদের কেউই কোনো কথা বলছেন না। আর সিল্কসিটি এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী হিরণ চৌধুরী জানান, অসুস্থ স্ত্রী এবং দুই সন্তান নিয়ে স্টেশনে অপেক্ষা করছেন। ট্রেনটি কখন আসবে জানা নেই। বেলা ১টায় স্টেশনে আসেন তারা। ট্রেনটি দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে ছাড়ার কথা। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ট্রেনটির কোনো খবর জানা যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুক্রবার পশ্চিমাঞ্চলে চলাচল করা সুন্দরবন, ধূমকেতু, নীলসাগর, রংপুর, দ্রুতযান, চিত্রাসহ সব কটি ট্রেনই বিলম্বে চলাচল করেছে। এসব ট্রেনের যাত্রীরা ২ ঘণ্টা থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত স্টেশনে অপেক্ষা করেন। এ ছাড়া কমলাপুর রেলস্টেশনে অপেক্ষমাণ বিভিন্ন রুটের বিপুলসংখ্যক যাত্রী অভিযোগ করেন, আসনের টিকিট থাকার পরও ট্রেনে উঠতে পারেননি। বিনা টিকিটিদের দৌরাত্ম্যে টিকিটধারী কিছু যাত্রী ট্রেনে উঠতে পারেননি। আবার কিছু যাত্রী ট্রেনে উঠতে পারলেও সিট পর্যন্ত যেতে পারেননি। পুরো পথেই দরজায় দাঁড়িয়েই যেতে হবে গন্তব্যস্থলে।
সরেজমিন আরও দেখা যায়, ট্রেনের ভেতরে ও ছাদে পা ফেলার জায়গা ছিল না। যাত্রীতে ঠাসা ছিল প্রায় সব কটি ট্রেন। এমন যুদ্ধে কেউ জানালার স্ট্যান্ডে পা দিয়ে ট্রেনের ছাদে ওঠার চেষ্টা করছেন, কেউ বা পরিবারের অন্য সদস্যদের জানালা দিয়ে ট্রেনের ভেতরে পাঠাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। শিশুদের জানালা দিয়ে ভেতরে দিতে পারলেও অনেক চেষ্টায় দরজা দিয়ে বড়রা ঢুকতে পারছিলেন না। ফলে বাধ্য হয়ে জানালা দিয়ে ট্রেনে উঠছেন। এতে অনেককে আহতও হতে দেখা গেছে। টিকিটধারী যাত্রীদের সহযোগিতা কিংবা সিট পর্যন্ত যেতে সাহায্য করা হয়নি রেল কর্তৃপক্ষ থেকে। বিশেষ করে নারী যাত্রীদের দুর্ভোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। পুরুষ যাত্রীদের ভিড়ে নারী যাত্রীদের ট্রেনে উঠতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল। শত শত লোক ছাদে উঠলেও তাদের প্রতিহত কিংবা বাধা সৃষ্টি করতে দেখা যায়নি। বিনা টিকিটের যাত্রীরা অনায়াসেই ট্রেনে উঠছিলেন।
নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী সোনিয়া আক্তার জানান, তিন সন্তান নিয়ে তিনি দিনাজপুর যেতে শুক্রবার সকাল ৭টায় কমলাপুর স্টেশনে আসেন। তার এক আত্মীয় স্টেশন পর্যন্ত তাদের দিয়ে গেছেন। ট্রেনটি দুপুর ১২টা পর্যন্ত স্টেশনে আসেনি। কখন যাবেন, ট্রেনে উঠতে পারবেন কি না- এমনটা ভেবে তিনি কান্না করছিলেন। এদিকে বিমানবন্দর রেলস্টেশনেও শথ শত যাত্রী ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। প্রতিটি ট্রেনই কমলাপুর থেকে ৩-৪ গুণ বেশি যাত্রী নিয়ে ছেড়ে গিয়ে বিমানবন্দর স্টেশনে বিরতি দেয়। ওই সামান্য যাত্রী ট্রেনে উঠতে পারলেও অধিকাংশ যাত্রীই ট্রেনের ছাদ ও দরজায় ঝুলে যেতে দেখা গেছে। বিমানবন্দর রেলস্টেশন প্লাটফর্ম এবং প্লাটফর্ম ছাদে (টিনশেড) শত শত যাত্রী অবস্থান করে। এক একটি ট্রেন আসতেই টিনশেডে অপেক্ষা করা যাত্রীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে উঠছিলেন। কমলাপুর রেলস্টেশন ম্যানেজার আমিনুল ইসলাম জুয়েল যুগান্তরকে জানান, শুক্রবার যাত্রীদের চাপ ছিল খুব বেশি। এক একটি ট্রেনে নির্ধারিত যাত্রীর চেয়ে ৩-৪ গুণ বেশি যাত্রী উঠেছে। পশ্চিমাঞ্চলে চলাচলকারী সব কটি ট্রেনই বিলম্বে চলাচল করেছে। এ ছাড়া দুপুরের দিকে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি টাঙ্গাইল বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব পাড়ে লাইনচ্যুত হওয়ায় ট্রেনগুলো চলাচলে আরও বিলম্ব হয়। তিনি বলেন, পশ্চিমাঞ্চল ছাড়াও পূর্বাঞ্চলে চলাচলকারী বেশ কটি ট্রেন বিলম্বে চলাচল করেছে। দেড় থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্বে ট্রেন চলাচল করেছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ট্রেন ধীরগতিতে চালাতে হচ্ছে। অন্যদিকে নির্ধারিত বিরতির (২-৩ মিনিট) স্থলে ১৭-২০ মিনিট পর্যন্ত বিরতি দিতে হচ্ছে এক একটি স্টেশনে। এতে করে ট্রেন চলাচলে বিলম্ব হচ্ছে, যাকে আমরা সিডিউল বিপর্যয় বলছি না।
ডাবল লাইন না থাকায় ট্রেন বিলম্ব : শুক্রবার দুপুরে কমলাপুর রেলস্টেশন পরিদর্শন করেছেন রেলপথমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন। ঘরমুখো যাত্রীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। এ সময় ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় নিয়ে সাধারণ যাত্রীরা মন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন। জানতে চান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রেনের সিডিউল কেন বিপর্যয় ঘটছে। এ সময় সাংবাদিকদের রেলপথমন্ত্রী বলেন, আমরা নতুন ট্রেন চালু করছি, কিন্তু বিলম্ব ঠেকাতে পারছি না। যত বেশি নতুন ট্রেন চালু হবে, বিলম্বও বাড়বে। যতদিন না পর্যন্ত পুরো রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করা যাচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত এ সমস্যা থেকেই যাবে। তিনি বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধীরগতিতেও ট্রেন চালানো হচ্ছে। প্রতিটি ট্রেন অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে। এ রেলপথ সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন, রেলওয়ে মহাপরিচালক শামছুজ্জামানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সড়কপথ : রাজধানীর বাস কাউন্টারগুলোতে গিয়ে যাত্রীদের গাড়ির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে তাদের। রাজধানীর সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, গাবতলী, শ্যামলী, কল্যাণপুর, মহাখালী সরেজমিন ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। এদিকে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া মানিকগঞ্জ ও আরিচামুখী গাড়িগুলো প্রচণ্ড যানজটের কবলে পড়ে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের গেণ্ডা থেকে নয়ারহাট বাজার পর্যন্ত প্রায় ১৪ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। সরেজমিন দেখা যায়, শুক্রবার সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে মানুষ বাস, সিএনজি অটোরিকশাসহ বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং মাধ্যমে বাস টার্মিনালে যাচ্ছেন। সকাল সাড়ে ৭টায় রাজধানীর গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজার এলাকায় দেখা যায়, দক্ষিণ অঞ্চলগামী (মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, পিরোজপুর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা) মানুষের উপচে পড়া ভিড়। সেখান থেকে ছেড়ে যাওয়া টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস, গ্রীন লাইন, ইলিশ পরিবহনসহ বিভিন্ন পরিবহনে উঠে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হচ্ছে। তবে এখান থেকে ছেড়ে যাওয়া পরিবহনগুলোতে দ্বিগুণ, তিনগুণ বেশি ভাড়া নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের। এছাড়া নগরীর শ্যামলী-কল্যাণপুর কাউন্টারে গাড়ির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।
কল্যাণপুরে রাশেদুল ইসলাম অনু নামে অপেক্ষমাণ এক যাত্রীর সঙ্গে কথা হয়। সকাল ৮টার বাসে ওঠার জন্য এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে রামপুরার বাসা থেকে শ্যামলীতে চলে এসেছেন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে। এসেই জানতে পারেন বাস আটকে আছে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে। ফেরিঘাট পার হয়ে পাটুরিয়া এসে একে ট্রাভেলসের বাসটি কখন শ্যামলীতে আসবে, এর সঠিক তথ্য দিতে পারছেন না কাউন্টারের লোকজনও। অনু কাউন্টারে গেলে তাকে বলা হয়, বাস ফেরি পার হয়নি। স্বাভাবিক সময় পাটুরিয়া থেকে শ্যামলীতে আসছে একটি বাসের সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। এখন শুনছি নবীনগর, সাভার সব জায়গাতেই যানজট। এরপর গাবতলী পশুর হাটের কারণে যানজট তো আছেই। তাই আজকে কখন যে বাসের দেখা পাব আর সাতক্ষীরা যেতে পারব বুঝতে পারছি না।’
সায়েদাবাদ টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায় টিকিট কালোবাজারি চক্রের দৌরাত্ম্য। পরিবহন কাউন্টারগুলো টিকিট নাই জানালেও কালোবাজারির মাধ্যমে টিকিট দিচ্ছে দালালেরা। বিনিময়ে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। ফারুক হোসেন নামে এক যাত্রী জানান, কাউন্টার থেকে টিকিট নাই বলে জানানো হচ্ছে অথচ কয়েক গজ দূরেই দেখা গেছে, অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে টিকিট বিক্রি করছে একশ্রেণির দালালরা। একই চিত্র উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বারখ্যাত গাবতলী বাস টার্মিনালেও। মহাখালী ও গাবতলী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায় কিছুটা ভিন্ন চিত্র। গাবতলী বাস টার্মিনালে মানুষের স্রোত থাকলেও মহাখালী ছিল অনেকটা স্বাভাবিক। মহাখালী থেকে ছেড়ে যাওয়া পরিবহনগুলোতে যাত্রীদের তেমন ভিড় লক্ষ্য করা যায়নি। জানতে চাইলে দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেলিমুজ্জামান বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ রাতদিন কাজ করে যাচ্ছে। এখনও পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা আমাদের কানে আসেনি। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশ সজাগ দৃষ্টি রেখেছে।
বঙ্গবন্ধু সেতুর দু’পাশে ৬০ কিলোমিটার যানজট : বঙ্গবন্ধু সেতুর দুপাশে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পথ জুড়েই যানজট ছিল। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী মহাসড়কের টাঙ্গাইল অংশে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বপাশে দীর্ঘ ৪০ কিলোমিটার এবং সেতুর পশ্চিমপাশে প্রায় ১৮ কিলোমিটারের মতো দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকেই থেমে থেমে যানবাহন চলছিল। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা। মির্জাপুর থেকে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বপাশ এবং পশ্চিমপাশে মুলিবাড়ি রেলক্রসিং থেকে হাটিকুমরুল মোড় পর্যন্ত এ যানজট ছড়িয়ে পড়েছে। সকাল থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মির্জাপুর থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোশারফ হোসেন বলেন, সিরাজগঞ্জে গাড়ি রিসিভ করতে সমস্যা হচ্ছে। এ কারণে টাঙ্গাইলের দিক যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। সেতুর ওপর পর্যন্ত গাড়ি আটকে আছে। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে গাড়ির চাপ বেড়েছে। আর শুক্রবার সকাল থেকে কয়েকগুণ বেশি গাড়ির চাপ পড়েছে। সকাল থেকে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়ে মুলিবাড়ি রেলক্রসিং থেকে হাটিকুমরুল মোড় পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম থানার ওসি সৈয়দ সহিদ আলম বলেন, হঠাৎ করেই একদিকে যানবাহনের চাপ, অন্যদিকে হুড়োহুড়ি করে যাবার সময় থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়ে ক্ষতিগ্রস্ত নলকা সেতু ও এরিস্ট্রোক্রেট মোড়ে সরু ইছামতি সেতুর কারণে যানবাহন চলাচলে ধীরগতি আসছে বলে জানান বগুড়া হাইওয়ে অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ।
নদীপথ : লঞ্চের ছাদেও ঈদযাত্রা। বৃহস্পতিবার সরকারি অফিস ছুটি হয়েছে। ছুটি মিলেছে গার্মেন্টসহ অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয়। বৃষ্টির কারণে ওইদিন যারা যেতে পারেননি সব চাপ পড়েছে গতকাল। শুক্রবার ভোর থেকেই মানুষ রওনা দেন বাড়ির পথে। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে এখন তারা ভিড় করছেন নৌপথেও। বর্ষা মৌসুমে আবহাওয়ার ঝুঁকি থাকলেও শুক্রবার ভোর থেকে সদরঘাটে যাত্রীচাপ ছিল সবচেয়ে বেশি। লঞ্চে যাত্রী বোঝাই হওয়ার পর ছাদেও নেয়া হয় যাত্রীদের। বেশিরভাগ লঞ্চ সময়মতো না ছেড়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কাজে ব্যস্ত ছিল। সুন্দরবন, টিপু, ফারহান, সুরভীসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন লঞ্চে ছাদে চড়ে যাত্রীরা গেছেন। লঞ্চের ছাদে যাত্রী পরিবহন আইনত নিষিদ্ধ। তদুপরি ঝুঁকি নিয়ে ছাদে করে মানুষ পরিবহন করে লঞ্চ মালিকরা। অথচ বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করে বিআইডব্লিউটিএসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এরকম অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং সময়মতো লঞ্চ না ছাড়ার কারণে শুক্রবার সদরঘাটে দুর্ঘটনাও ঘটে। এমভি ফারহান নামের লঞ্চটি শুক্রবার সদরঘাটের পন্টুনে ভেড়ানো ছিল। আসন বোঝাই হওয়ার পর ছাদসহ বিভিন্ন কোনাকানছিতে যাত্রী তোলায় ব্যস্ত ছিল লঞ্চকর্মীরা। একই সময়ে দ্বীপরাজ নামের লঞ্চটি ঘাটে ভেড়ানোর সময় ধাক্কা দেয় এমভি ফারহানকে। এতে করে পন্টুনে থাকা বেশ কয়েকজন যাত্রী গুরুতর আহত হন। জিল্লুর রহমান নামের এক যাত্রী জানান, ফারহান ৭ লঞ্চটি যাত্রী ভরপুর হওয়ার পরও লঞ্চটি ছাড়েনি। দুপুর ১টায় যাওয়ার কথা থাকলেও তা বিকাল ৫টার পরও ছাড়েনি। শুক্রবার বিকালে সদরঘাট লঞ্চটার্মিনাল পরিদর্শন করেন নৌ সচিব আবদুস সামাদ। নিয়ম মেনে লঞ্চ চালাতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন তিনি।
এদিকে যাত্রী পরিবহন ও সার্বিক অবস্থা প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (বন্দর) শফিকুল হক বলেন, দুটি লঞ্চের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিতে কয়েকজন আহত হন। কেউ মারা যায়নি। অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করতে মালিকদের অনুরোধ করেছি। নির্দেশনা অমান্য করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। গতকাল শতাধিক লঞ্চ বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে ঢাকা নদীবন্দর ত্যাগ করে। ঈদযাত্রায় মহাসড়কে নয়, সমস্যা ফেরিঘাটে – ওবায়দুল কাদের : ঈদুল আজহায় ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি ফেরার পথে সড়ক-মহাসড়কে যাত্রীদের কোনো সমস্যা নেই বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তবে ফেরিঘাটে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। শুক্রবার সকালে গাবতলী বাস টার্মিনালে ঈদযাত্রা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে গিয়ে এসব কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, ঈদযাত্রায় মহাসড়কে সমস্যা না হলেও ফেরিঘাটে সমস্যা হচ্ছে। সমস্যা হচ্ছে পাটুরিয়া দৌলতদিয়া ঘাটে, নদীতে প্রচণ্ড স্রোত। মাওয়া থেকে জাজিরা প্রান্তেও প্রচণ্ড স্রোত। সেখানে মাঝে মাঝে ফেরি বন্ধ হয়ে যায়। নদীর স্রোতের কারণে ফেরি চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। এ কারণে গাড়ি আসতে পারছে না। শিগগিরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে উল্লেখ করে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বৃহস্পতিবার ভারি বর্ষণ ছিল, সিগন্যাল (সতর্ক সংকেত) ছিল, নিুচাপের কারণে ঘরমুখো যাত্রা স্বস্তিদায়ক ছিল না। তবে শুক্রবার ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক। ভারি বর্ষণ না হলে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া না থঅকলে ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক হবে বলে আমার মনে হয়। কারণ ফেরিঘাটে সমস্যা থাকলেও সড়কে কোনো সমস্যা নেই।

ভাগ