ইংরেজি পরিহার কি জরুরি?

তৈমূর আলম খন্দকার
পৃথিবীতে যত না রাষ্ট্র বা জাতি রয়েছে, তার চেয়ে বেশি রয়েছে ভাষার প্রকার ভেদ। যার ‘মা’ যে ভাষায় কথা বলে সে ভাষাই তার জন্য ‘মাতৃভাষা’। একজন বাঙালি পিতার সন্তান ইংরেজি ভাষাভাষী মায়ের গর্ভে জন্ম নিলে ইংরেজিই হবে তার মাতৃভাষা। অবিভক্ত বাংলার মানুষের মাতৃ ভাষা ‘বাংলা’। বাংলা ভাষার রকমভেদ মোটা দাগে সাধু ও চলতি ভাষাভিত্তিক হলেও এর বিভিন্ন প্রকার ভেদ রয়েছে অঞ্চলভিত্তিক। বাংলাদেশে এমন কিছু আঞ্চলিক ভাষা রয়েছে যা বুঝে উঠতে গিয়ে অন্য অঞ্চলের মানুষের অনেক সময় সমস্যা হয়ে পড়ে। তার পরও প্রমিত বাংলা ভাষাই এ দেশের মানুষের মাতৃভাষা। মাতৃভাষার স্বীকৃতির জন্য অনেক রাষ্ট্রেই আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে। কিন্তু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার জন্য যে সংগ্রাম হয়েছে পৃথিবীর অন্য কোনো রাষ্ট্রে তা হয়নি। এর পেছনেও রয়েছে দীর্ঘ প্রেক্ষাপট।
‘ভারত স্বাধীনতা আইন’, ১৯৩৫ মোতাবেক ১৯৪৭ সালের আগস্টে পাকিস্তান ও ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। তখন ‘অবিভক্ত বাংলা’ ভারতের একটি অংশ ছিল। ১৯৪৭ এ পাকিস্তানের অংশ হিসেবে পূর্ব বাংলা স্বীকৃত হয়। এটা স্বাধীন পাকিস্তানের অংশ হলেও তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানই পূর্ব বাংলা অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানকে শাসন শোষণ করেছে। ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ মর্মে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঘোষণার মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তান মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বীজ রোপিত হয়েছিল। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে হরতাল পালিত হয়। এটি ছিল পাকিস্তানোত্তর প্রথম হরতাল। তমদ্দুন মজলিস ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ যৌথভাবে এই কর্মসূচি ঘোষণা করে এবং সমগ্র প্রদেশে সফলভাবে হরতাল পালিত হয়। হরতালের দিন ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা হবে’ মর্মে প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কর্মপরিষদের একটি লিখিত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৫২ সালের আগ পর্যন্ত প্রতি বছর ১১ মার্চকে ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হতো। কিন্তু খাজা নাজিমুদ্দিন ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি গভর্নর জেনারেল হিসেবে পল্টন ময়দানে এক জনসভায় ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। ফলে ভাষা আন্দোলন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই ঘোষণার প্রতিবাদে ধর্মঘট পালন করেছিল। এই ঘোষণার এক মাসেরও কম সময়ে আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে এবং ২১ ফেব্রুয়ারির বিয়োগান্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে সাফল্য আসে। ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে সর্বদলীয় বৈঠক হয়। বৈঠকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পরিচালনার জন্য ৪০ সদস্যের একটি সর্বদলীয় কর্মপরিষদ গঠিত হয়েছিল।
যা হোক, একটি বিরাট জনগোষ্ঠীকে নিরক্ষর রেখেই প্রতি বছর ‘ভাষা দিবস’ উদযাপিত হচ্ছে। নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তবে প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’- এটাই ছিল ভাষা আন্দোলনের মূল বক্তব্য। আন্দোলনটির ইতিহাস রক্তের অক্ষরে লেখা। কিন্তু বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভের পাশাপাশি ‘বাংলা’কে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কাজ অথবা ফাউন্ডেশন ওয়ার্ক সেভাবে শুরু করা হয়নি। এর মূল কারণ বিশ্বব্যাপী রয়েছে, ইংরেজি ভাষার ব্যাপক প্রভাব। যেমন- পুলিশের গুলিতে ১৯৫২ সালে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে ছিল ৮ ফাল্গুন। কিন্তু তারিখটি প্রতিষ্ঠিত হলো ইংরেজি দিন পঞ্জিকা মোতাবেক অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারি। পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রেও ইংরেজি পঞ্জিকা অনুসরণেই দিনটি ‘অমর একুশে’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ বিষয়টি যদি ‘অমর ফাল্গুন’ নামে প্রতিষ্ঠিত হতো এবং প্রতি বছর ৮ ফাল্গুন হিসেবে অন্যান্য রাষ্ট্রে দিবসটি পালিত হতো, তবে কি বাংলার প্রতি বিশ্ব জগতের দৃষ্টি আরো গভীরভাবে আকৃষ্ট হতো না? এমনিভাবে ইংরেজির অনেক প্রভাব বাংলাতে রয়েছে এবং দিনে দিনে ব্যাপক হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’ যদি ‘ফাল্গুন মানে মাথা নত না করা’ বলে প্রতিষ্ঠিত বা প্রচলন করা হলে কি বাংলার প্রতি আরো যতœবান হওয়া যেত না? ‘৮ই ফাল্গুন’কে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ কি এখন আর নেই? বাংলা ভাষার ওপর বিদেশী প্রভাব অনেক বেশি। ভিন্ন দেশী সংস্কৃতিকে অনুসরণ করে অনেক মানুষই নিজেকে অভিজাত শ্রেণীভুক্ত করার আশা করে। মাঠে ঘাটে খেটে খাওয়া মানুষ, পথে পথে ঘুরে বেড়ানো বাউল, দরবেশ, ফকিররা বাংলার সংস্কৃতিকে যেভাবে লালন করে থাকেন, দেশের অভিজাত শিক্ষিত সমাজ সেভাবে খাঁটি বাঙালিয়ানার পরিচয় প্রদান করে না। পক্ষান্তরে কাঁটা চামচে খাওয়া এবং আধা বাংলা আধা ইংরেজি অর্থাৎ মিশ্র ভাষায় অবিরত কথা বলাকে অনেকে অভিজাত শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্তির শর্ত ভেবে তৃপ্তি পায়। পোশাক পরিচ্ছদেও গণবিচ্ছিন্ন মানসিকতা অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা লালন করছে। ফলে ভাষা হিসেবে ‘বাংলার’ প্রচলন এবং সংস্কৃতিতে এর লালনের পরিবর্তে বাঙালিরা দিনে দিনে মিশ্র সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। হালে ‘বাংলা সংস্কৃতি’ একটি আনুষ্ঠানিকতায় রূপান্তরিত হয়েছে। যেমন- ১ বৈশাখ, নবান্ন, পিঠা উৎসব, পৌষ মাসের মেলা প্রভৃতি। রাষ্ট্র দেশীয় খেলাধুলাকে এড়িয়ে বিদেশী খেলাধুলার প্রতি বেশি নজর দিচ্ছে এবং ঢালছে কোটি কোটি টাকা। নৌকাবাইচ, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগ লড়াই, হাডুডু, কাবাডি প্রভৃতি দেশীয় ক্রীড়া পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে না।
বাংলা সংস্কৃতিকে লালন করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে যে প্রতিষ্ঠানটি দায়িত্বপ্রাপ্ত, তা হলো বাংলা একাডেমি। তবে ‘একাডেমি’ শব্দটির উৎপত্তি বাংলার কোষ থেকে নয়। প্রতিষ্ঠানটি ক্ষমতাসীন দলের একটি অঙ্গে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ দিন বলছে এটা, যেখানে কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই এবং সরকারি দল ভিন্ন অন্য কোনো মতাদর্শের লেখক বা লেখার স্থান দেয়া হয় না। ফলে একাডেমি কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ সবই একপেশে এবং সরকারের গানভিত্তিক। বই প্রকাশনা বা গবেষণা মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে বিশেষ আনুগত্যকেই বেশি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে, অথচ সৃজনশীল সৃষ্টিকে প্রাধান্য দেয়া হয় না। রাষ্ট্রের মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার যাদের সরকারি প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। সরকার সামাজিক, পেশাভিত্তিক, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল নিয়ে তা একপেশে করে ফেলছে, যার ফলে জাতীয় সংস্কৃতি সার্বিক ও সার্বজনীনভাবে গড়ে ওঠা বাধা পাচ্ছে।
প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা, বাঙালির ইতিহাস আছে, মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করার ঐতিহ্য রয়েছে। অন্য দিকে আপসকামিতার জন্য একটি শ্রেণীর উৎসাহ চোখে পড়ার মতো। সংস্কৃতি ও ভাষার সাথে এক শ্রেণীর লোকের আপসকামিতার কারণেই ‘মনে পড়ে যায় একদিন বাঙালি ছিলাম রে’ ধরনের গানগুলোর সৃষ্টি হয়েছে। মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা, আন্তর্জাতিক ভাষা, ধর্মীয় ভাষা প্রভৃতি জাতিগতভাবে প্রতিষ্ঠিত করা প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি। মাতৃভাষাকেই হতে হবে রাষ্ট্রভাষা। মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষা হওয়ার অর্থ এই নয় যে, আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজিকে গুরুত্বহীন করে দিতে হবে। কারণ আন্তর্জাতিক বিশ্বে প্রতিটি রাষ্ট্র একে অপরের সাথে সুসম্পর্কের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। এর ফলে শিক্ষার ক্ষেত্রে ইংরেজিকে গুরুত্বহীন করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। বাঙালির ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য বাংলার ওপর গবেষণা এবং বাংলা ভাষার প্রয়োগ ও প্রচলন জরুরি। অন্য দিকে, আন্তর্জাতিক ভাষার আবশ্যকীয় শিক্ষার ও প্র্যাকটিসের ওপর গুরুত্ব দেয়াও জরুরি। মানুষকে মানবিক ও নৈতিকতাপূর্ণ মানসিকতায় গড়ে তোলার জন্য ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। কোনো ধর্মীয় বাণীই বাংলা ভাষায় রচিত হয়নি। বাংলাদেশ হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী রয়েছে যাদের নিজ নিজ ধর্মীয় ভাষা আছে। যেমন- মুসলমানদের আল কুরআন আরবি ভাষায়, হিন্দুদের বেদ সংস্কৃত ভাষায় রচিত প্রভৃতি। নিজ নিজ ধর্মীয় ভাষার প্রতিও সমভাবে গুরুত্ব দিয়ে এর শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহারের দাবি উঠেছে। আদালত থেকে বাংলা ভাষাকে উঠিয়ে দিলে আইনাঙ্গন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কতটুকু সমৃদ্ধিশালী হবে তাও ভেবে দেখা দরকার।
অন্য কোনো ভাষায় পারদর্শী হওয়া মাতৃভাষার প্রতি অবজ্ঞা নয়। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুউল্লাহ অনেক ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। মহাকবি ইকবালের পাণ্ডিত্য শুধু উর্দু ভাষায় ছিল না। ভাষাভিত্তিক ঐতিহ্য লালন করা বা নিজ ভাষার প্রতি যত্নশীল হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য ভাষার প্রতি গুরুত্ব দেয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে বা উচ্চ আদালতে ‘বাংলা’ ভাষা চালু করার দাবি উঠেছে এবং এ জন্য কমিটি গঠিত হয়েছে। বিজ্ঞান, গবেষণা বা অনুসন্ধানমূলক যেসব গ্রন্থ রচিত হয়েছে তা বাংলা ভাষায় খুবই নগণ্য। ইংরেজিকে সম্পূর্ণ পরিহার করার আগে এ বিষয়গুলোও চিন্তা করা জরুরি।
লেখক : আইনজীবী এবং জীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি সদস্য, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ
E-mail: taimuralamkhandaker@gmail.com
ভাগ