আয়রন ল অব অলিগার্কি

ড. আবদুল লতিফ মাসুম
আয়রন ল অব অলিগার্কির বাংলা হতে পারে গোষ্ঠীতন্ত্রের লৌহকাঠামো। অনেকসময় বাংলা প্রতিশব্দ দিয়ে বিষয়টির গুরুত্ব ও যথার্থতা প্রকাশ পায় না। তাই ইংরেজির ব্যবহার। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আয়রন ল অব অলিগার্কি টার্মটি ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক দল ব্যবস্থাপনায় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ বোঝানোর জন্য। জার্মান সমাজতত্ত্ববিদ রবার্ট মিচেল (১৮৭৫-১৯৩৬) তার গ্রন্থ ‘পলিটিক্যাল পার্টিস, দ্য আয়রন ল অলিগার্কি’তে সামাজিক, আমলাতান্ত্রিক বিশেষত রাজনৈতিক দল নিয়ন্ত্রণে কঠিন, কঠোর ও অনতিক্রম্য বিধিনিষেধ বা নিয়ন্ত্রণের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে মিচেল তার বক্তব্যের বাস্তবতা প্রমাণ করতে সক্ষম হন। পরবর্তীকালে এ বিষয়ে নানা ধরনের বিতর্ক উত্থাপিত হলেও বিজ্ঞজনদের গবেষণায় তত্ত্বটি প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জন করে। ১৯৫৪ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডুভারজার কর্তৃত্ববাদ ও স্বৈরতন্ত্রকে রাজনৈতিক দল ব্যবস্থাপনায় অপ্রিয় বাস্তবতা বলে স্বীকার করেন। বস্তুত গণতন্ত্র নির্মাণে আজকাল রাজনৈতিক দলের ভূমিকা একটি অপরিহার্য বিষয়। ২০০৫ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় স্ক্যারো দেখান যে, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং রাজনৈতিক উন্নয়নে রাজনৈতিক দল ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, কোনো কোনো রাষ্ট্রে এবং তৃতীয় বিশ্বে সাধারণভাবে গণতন্ত্রের নিরঙ্কুশ ও নিরাভরণ ব্যবহারের পরিবর্তে গণতন্ত্রের খোলসটুকুই ব্যবহার করা হয়। এসব লৌহমানবরা যখন গণতন্ত্র বাদে অন্য কিছু বাস্তবায়ন করতে চান, তখন গণতন্ত্রকে তাদের খুশিমতো শব্দ দিয়ে বিশেষায়িত করেন। যেমন- পাকিস্তানের শক্তিধর সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান আদি, অকৃত্রিম ও আসল বেসিক ডেমোক্র্যাসি বা বুনিয়াদি গণতন্ত্র চালু করেছিলেন। ইন্দোনেশিয়ার নেতা ‘গাইডেড ডেমোক্র্যাসি’ বা নির্দেশিত গণতন্ত্র প্রবর্তন করেছিলেন। মিসরের জামাল আবদুল নাসের ‘কন্ট্রোলড ডেমোক্র্যাসি’ বা নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র দিয়ে আসল গণতন্ত্রের সর্বনাশ সাধন করেছিলেন। আমাদের দেশে ‘এক নেতা এক দেশ’ স্লোগানে শোষিতের গণতন্ত্র কায়েম করার প্রয়াস চলেছিল। মজার ব্যাপার এই যে, সব ক্ষেত্রেই একটি রাজনৈতিক দলকে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর সর্বময় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব থাকে একজন ব্যক্তির হাতে। পার্টি ব্যবহার হয় ব্যক্তি ও সরকারের প্রশস্তি গাওয়ার জন্য। সুতরাং দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার কোনো সুযোগ থাকে না। গণতন্ত্রের প্রবক্তারা বলেন, দলে কথা ও কাজের মিল থাকতে হবে। একটি রাজনৈতিক দল যদি স্বৈরতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হয়, তার নেতাকর্মীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সঞ্চারিত হতে পারে না। এটি বাইরে থেকে আরোপিত বিষয় নয়। একটি রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক না অগণতান্ত্রিক সেটি বোঝনোর জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্ক্যারো তিনটি মানদণ্ড বা নমুনার উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো- ১. নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া; ২. সরকারি পদে বা সংসদে মনোনয়নের প্রথা-পদ্ধতি ও ৩. নীতিনির্ধারণ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নেতাকর্মীদের ভূমিকা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা আরো কিছু বিষয়-বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন। যেমন- নেতৃত্বে সমাজের সব পর্যায়ের সব ধরনের ব্যক্তির উপস্থিতি। দল পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, শান্তিপূর্ণ উপায়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিরোধের মীমাংসা। বাংলাদেশের প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান তার সাম্প্রতিক গ্রন্থ ‘পলিটিক্যাল পার্টিস ইন বাংলাদেশ, চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ডেমোক্র্যাটাইজেশন’ গ্রন্থে এসব মানদণ্ডে বাংলাদেশের প্রধান চারটি দলের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক অবস্থা অনুসন্ধান করেছেন। ২০০৮ সালে সংশোধিত ‘রিপ্রেজেন্টেশন অব পিপল অর্ডার’-এর কিছু ধারায় দলে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যেমন- নির্বাচনী প্রার্থী বাছাইয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মতামত গ্রহণ, ৩৩ শতাংশ মহিলা প্রতিনিধিত্ব এবং তৃণমূল পর্যায়ে গুরুত্ব আরোপ। পশ্চিমা গণতন্ত্রে কমবেশি এগুলো দৃশ্যমান। কিন্তু আমাদের ‘তৃতীয় তরঙ্গের গণতন্ত্রে’ প্রায় সর্বত্রই এটি অনুপস্থিত। যে উদারতাবাদ গণতন্ত্রের মূলভিত্তি, তার নামগন্ধ না থাকায় ফরিদ জাকারিয়া আমাদের মতো গণতন্ত্রকে বলেছেন- ‘ইললিবারেল ডেমোক্র্যাসি’ বা অনুদার গণতন্ত্র। অন্যরা অনেক বিশেষণ আরোপ করেছেন- কপট গণতন্ত্র, আংশিক গণতন্ত্র, নিম্নমানের গণতন্ত্র, শূন্য গণতন্ত্র ইত্যাদি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রিয়াজ তার সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থ ‘ভোটিং ইন হাইব্রিড রেজিম, এক্সপ্লেইনিং দ্য ২০১৮ বাংলাদেশী ইলেকশন’ সম্পর্কে একই ধরনের মন্তব্য করেছেন।
উল্লিখিত মানদণ্ডগুলোর ভিত্তিতে আমরা এখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করব। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে স্পষ্টভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে সব স্তরের নেতৃত্ব গঠনের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। দলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সভাপতিমণ্ডলীর সব সদস্য এবং সংসদীয় সদস্য নির্বাচন বোর্ডের সব সদস্য ত্রিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন বলে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে। তবে জাতীয় কমিটিতে ১৬৬ জনের ২১ জন এবং ৭৩ জনের কার্যনির্বাহী কমিটিতে দলীয় সভাপতি মনোনয়ন দেবেন। দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সবাই দলীয় সভাপতির অনুমোদনে অভিষিক্ত হবেন। দলীয় সভাপতির কর্তৃত্বের পরিধি ও মনোনয়নের আধিক্য লক্ষ করে সভাপতির কর্তৃত্বের পরিধি অনুমান করা যায়। আর বাস্তব ক্ষেত্রে এ ধরনের উত্তরাধিকার দলের সব কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত যে সভাপতি নিয়ে থাকেন, তা দীর্ঘকালের ইতিহাসই প্রমাণ করে। কাউন্সিল অধিবেশন হয় বটে, বাংলাদেশের প্রধান দু’টি দলের সব ক্ষমতা আরোপিত হয় শীর্ষ নেতৃত্বে। এবার তথাকথিত শুদ্ধি অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগে দৃশ্যত রদবদলের হিড়িক শোনা যাচ্ছে। তবে দলীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছেন, দলীয় সভাপতি পদে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। সাধারণ সম্পাদকসহ সব পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন যে নেতৃত্বের ইশারা-ইঙ্গিতে হবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজনৈতিক দলের সংস্কার চান এ রকম বুদ্ধিজীবীরা অবশ্য দীর্ঘকাল ধরে বলে আসছেন, দলীয় প্রধান ও সরকারপ্রধান- একজন না হওয়াই উত্তম। উন্নত দেশে তো বটেই, তৃতীয় বিশে^র বিভিন্ন দেশে এর যথেষ্ট উদাহরণ রয়েছে। ভারতে এ মুহূর্তে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী এক ব্যক্তি নন। ভিন্ন ব্যক্তি হলে শীর্ষ নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বে ভাটা পড়বে এমন নয়। তবে পৃথক পৃথক নেতৃত্ব দৃশ্যত শোভন ও বিকেন্দ্রীকরণ নির্দেশ করে। এবার আসা যাক বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনে পার্টির মনোনয়ন প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে। আওয়ামী লীগ গঠনতন্ত্রের ২৭ ধারায় জাতীয় সংসদসহ সব ধরনের নির্বাচনের জন্য একটি কমিটি বা বোর্ড গঠনের কথা বলা হয়েছে। দলীয় সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির প্রধানসহ এর সদস্য সংখ্যা ১১। কার্যকাল স্থির করে দেয় জাতীয় কাউন্সিল। গঠনতন্ত্রের বিধি মোতাবেক জেলা সাধারণ সম্পাদকের মাধ্যমে উপজেলা ও জেলা কমিটির বিস্তারিত মতামতসহ দরখাস্ত করতে হয় পার্লামেন্টারি বোর্ডকে উদ্দেশ করে। বিগত নির্বাচনগুলোতে কার্যত আওয়ামী লীগ অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিয়েছে। সব ক্ষেত্রেই দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্তই যে শেষ কথা, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাতীয় পর্যায়ের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো কদাচিৎ জাতীয় কমিটি বা সমপর্যায়ে গৃহীত হয়ে থাকে। এর বড় একটি কারণ, সংশ্লিষ্ট সদস্যরা বিষয়টি সম্পর্কে বিশেষ অভিজ্ঞতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পোষণ করেন না। তবে আওয়ামী লীগ একটি ‘জনতুষ্টিমূলক’ সংগঠন হওয়ার কারণে সব সময়ই জনগণের ভাষায় কথা বলতে চেষ্টা করে। এর বেশ কয়েকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগকে নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়ে সহায়তা করে। জনতুষ্টি দলের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এরা এমন সব প্রতিশ্রুতি দেয়, যা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ক্ষমতাসীন দলের আরেকটি নীতিগত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় না এনে দলীয় স্বার্থকে প্রধান্য দেয়া। এ ক্ষেত্রে মাথাভারী আমলাতন্ত্র, কর্মসংস্থানের বিষয় এবং প্রতিবেশী দেশের সাথে অসম সম্পর্কের উদাহরণ দেয়া যায়। প্রতিবেশী দেশ থেকে কোনোরকম ট্রানজিট ফি না নেয়ার সিদ্ধান্ত উল্লেখ করা যায়। রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছেÑ ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, গোত্র ও বিবিধ পেশার মানুষের উপস্থিতি। একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগে ধনিক-বণিক শ্রেণীর প্রাধান্য রয়েছে। সেখানে মহিলা নেতৃত্বের যথার্থতা রয়েছে। সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব যেকোনো দলের চেয়ে বেশি রয়েছে। দলের আর্থিক তহবিলের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রসঙ্গে এটুকু বলা যায়, আর সব দলের মতো এখানেও কোনো জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নেই। দীর্ঘ প্রায় এক যুগ ধরে ক্ষমতায় থাকার কারণে তাদের প্রাচুর্য ও অর্থের প্রাবল্য রয়েছে। সম্প্রতি ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি শেষে এ রকম তথ্যই সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের আরেকটি নমুনা- অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সঙ্কট নিরসনে নেতৃত্বের সক্ষমতার বিষয়টিতে আওয়ামী লীগে অসম্ভব দুর্বলতা ও নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে। প্রায় প্রতিদিন সংবাদপত্রে তাদের অভ্যন্তরীণ সঙ্কটের কারণে খুন, জখম, সহিংসতার সংবাদ দেখা যায়। নেতৃত্বের কোন্দলে সম্মেলন পণ্ড হচ্ছে। সামাজিক ও পারিপাশির্^ক পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কোনো পর্যায়েই নেই। নেতৃত্বের প্রতি সতত আনুগত্য অনুপস্থিত। নেতাকর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক ক্রমেই স্বার্থ সুবিধার দ্বন্দ্বে বিষিয়ে যাচ্ছে। আর এসবই আয়রন ল অব অলিগার্কির মাধ্যমে যে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে তার কুফল।
আয়রন ল অব অলিগার্কি বা বিকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো- ‘প্রেট্র্রন-ক্লায়েন্ট রিলেশন’ বা পোষ্য-পোষক সম্পর্ক। এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রযন্ত্রের শাসকগোষ্ঠী একদল সুবিধাভোগী, অনুগত এবং সহিংস জনগোষ্ঠী তৈরি করে। রাজধানী থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত হয় তাদের পোষকের লম্বা হাত। ইউনিয়ন পরিষদের মতো নিরপেক্ষ ও মাটি-মানুষের কাছাকাছি বিষয়টিও হয়ে ওঠে হানাহানি ও রক্তারক্তির কারণ। ২০০২ সালে কিছু উন্নয়নশীল দেশে পরিচালিত সমীক্ষায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রানডাল ও সভাসন্দ পরিচালিত গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, এ ব্যবস্থায় সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সহায়তা, ব্যবসা-বাণিজ্য, উন্নয়ন কার্যক্রম এমনকি ত্রাণসামগ্রীর একমাত্র মালিক-মোক্তার হচ্ছে শাসক দলের লোকরা। পোষ্য-পোষক সম্পর্ক দু’টি পর্যায়ে কাজ করে। প্রথমত, দলের অভ্যন্তরীণ আদান-প্রদানের মাধ্যমে নেতাকর্মীকে নির্ভরশীল করে তোলে। অপর দিকে, অনুগ্রহ বিতরণ করে নেতাকর্মীরা দলের বাইরে একদল উচ্ছিষ্টভোগী লোকজন তৈরি করে। ভিন্নমতের বা অন্য দলের নেতাকর্মীরা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা, চাকরি এবং ত্রাণসামগ্রী থেকেও বঞ্চিত হয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের বাইরের কর্তৃত্বশালী ব্যক্তিরা একই পথ অনুসরণ করেন। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, সম্প্রতি একজন ভাইস চ্যান্সেলর প্রকাশ্যে শাসক দলের ছাত্র অংশকে পোষকতার ঘোষণা দেন। পোষক-পোষ্য সম্পর্কের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো- প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুন, রীতি-রেওয়াজ ও প্রথা-পদ্ধতি অচল করে দেয়া। সে ক্ষেত্রে যে কাউকে ঠিকাদারি দেয়া যায়, ঘুষ ও দুর্নীতির বিনিময়ে চাকরি দেয়া যায় এবং যারা এসব করেন তাদের পাইকারি পদোন্নতি দেয়া হয়। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা না দিয়েও ভর্তি হওয়া যায়। নেতা নির্বাচন ও কর্তৃত্ব বণ্টনে নিজেদের প্রণীত আইনও অগ্রাহ্য এবং অস্বীকার করা যায়। পোষক-পোষ্য সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিকতা এমন ঘটে যে, কেউ যেন গোষ্ঠীতন্ত্রের লৌহকাঠামো অতিক্রম করতে না পারে। এই ব্যবস্থার আর একটি দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- সেখানে পার্টির আদর্শ, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের কোনো বিষয়ই গুরুত্ব পায় না। রাজনৈতিক কর্মসূচি পালিত হয় সরকারি আদেশ বা আদেশের মতো। সংবিধান, সরকার ও রাজনৈতিক দল একাকার হয়ে যায়। স্থানীয় পর্যায়ে ওসি বা ডিসির অস্তিত্ব অনুভূত হয় না। সরকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ আইন, বিচার ও শাসন বিভাগ একাকার হয়ে যায়। নিশীথ রাতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত পার্লামেন্ট সদস্যও বলতে পারেন আইন বিভাগ এবং বিচার বিভাগের কোনো বিভাজনরেখা দৃশ্যমান হচ্ছে না।
বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ দল ও কর্মসূচির পক্ষে প্রচারণা চালায়। নাগরিকসাধারণ বলতে পারে, ‘আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাকে দেবো।’ কিন্তু আয়রন ল অব অলিগার্কি বা গোষ্ঠীতন্ত্রে পরিচালিত রাষ্ট্রে শুধু একটি দলই প্রচারণা চালাতে পারে। যারা প্রকৃতপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারে তাদের প্রচারণা তো দূরের কথা, ঘর থেকেই বের হতে দেয়া হয় না। তাদের পোস্টারের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা এমন সব কথা বলে, ভীতি প্রদর্শন করে এবং ভোটের আগেই বিরোধী কর্মী-সমর্থকদের আটক করে, মামলা দিয়ে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়ে অকার্যকর করে দেয়। তারা ১০ টাকা দরে চাল খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। পরে ১০ টাকা দরে সরকারি চাল সাধারণ্যে বিক্রি করলেও মূলত পার্টির লোকরা তা বেমালুম হজম করে নেয়। গোষ্ঠীতন্ত্রের নেতারা খাতাপত্রে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেন, অথচ রাজনৈতিকভাবে ধর্মকে ব্যবহার করেন। বিতর্কিত ধর্মীয় নেতাকে রাজপ্রাসাদে আমন্ত্রণ জানান। কখনো কখনো তাদের নেতা-নেত্রীরা মদিনা সনদের কথা বলেন। গোষ্ঠীতন্ত্রের একক নেতাদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের প্রয়োগ ও পদ্ধতি দুটোই অগণতান্ত্রিক। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও সহিংসতা তাদের নিত্যদিনের কর্মসূচি। দুর্নীতি হচ্ছে তাদের ক্ষমতার প্রধান বাহন। শক্তি প্রয়োগে তারা এতটাই নির্দয় যে, কোনো মানবিক বা সামাজিক অনুভূতি কাজে আসে না। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর লোকজনকে তারা দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার করেন। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের এক টাকাও খরচ না করে সব টাকাই তুলে নেয়ার বিস্তর উদাহরণ রয়েছে এই দেশে। তারা ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপারে ন্যায়-অন্যায়ের ধার ধারেন না। তাই জুয়া, নেশা ও ক্যাসিনো ব্যবসা তাদের এতটাই দম্ভ ও দৌরাত্ম্য দিয়েছে যে, তারা কাউকেই পরোয়া করেন না। সমাজ যখন এসব দেখে বিদ্রোহ ও বিপ্লবের আয়োজন করে, তখন তারা হঠাৎ করেই ভালোত্বের ঘোষণা দেন। যে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী তাদের অবৈধ ব্যবসায়ের দেখাশোনা করেছে, তারা হঠাৎ করেই আইনের সপক্ষে বড় বড় কথা বলে। তথাকথিত শুদ্ধাচারের মহড়া দেখায়। এভাবে মূল দল ও সহযোগীরা যখন নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন ভালো মানুষ দিয়ে মহড়া দেখান তারা। দলীয় নেতৃত্বের বিভিন্ন স্তরে সম্মেলন দিয়ে নতুন বোতলে পুরনো মদ সরবরাহ করেন তারা। উদ্দেশ্য, ভবিষ্যৎ সমাজবিপ্লব প্রতিহত করা। ক্ষমতার ভিতকে শক্ত করে তোলার জন্য বিভিন্ন পেশা, শ্রেণী ও স্বার্থগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে গোষ্ঠীতন্ত্রের বাহকে পরিণত করতে চান। সে ক্ষেত্রে দেশপ্রেম ও গণতন্ত্র কিছুরই তোয়াক্কা করেন না তারা। এমনকি অযাচিত শক্তিকে যাচিত ক্ষমতায় অধিষ্ঠানে হয়তো তাদের আপত্তি নেই।
শুধু ক্ষমতাসীন দলে নয়, সব দলেই কমবেশি এসব প্রবণতা দৃশ্যমান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অনেকগুলো গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বাংলাদেশের সার্বিক গণতন্ত্রায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা না থাকাই প্রধান সমস্যা। (রওনক জাহান : ২০১৫ : ১৮৪)। যুগের পর যুগ ধরে রাজনৈতিক দলে একই নেতৃত্ব বজায় রয়েছে। বাংলাদেশে বিকশিত দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় যে রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রতিষ্ঠা ঘটেছে তা অনন্য এবং অনতিক্রম্য। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারই নয়, বরং আরো চার নেতার উত্তরাধিকার স্বীকৃত হয়েছে। বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় এই উত্তরাধিকারের প্রবণতার প্রকৃষ্ট প্রমাণ রয়েছে। আওয়ামী লীগের যে সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে তা কার্যত নামমাত্র। কাউন্সিল অধিবেশন প্রতি তিন বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয় বটে তা কার্যত আলঙ্কারিক। বিভিন্ন সাংগঠনিক কাঠামো থাকলেও বিধি মোতাবেক তাদের সভা ও বৈঠক খুব কমই অনুষ্ঠিত হয়। পার্টি পরিচালিত হয় নেতা বা নেত্রীর আদেশে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলী এবং বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভা বেশি করে অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, এসব সভায় পার্টিপ্রধানের প্রাধান্যই পরিলক্ষিত হয়েছে। খুব কম সদস্যই দ্বিমত করার সাহস রাখেন। আয়রন ল অব অলিগার্কি বা গোষ্ঠীতন্ত্র শাসিত রাজনৈতিক দল : আওয়ামী লীগের পোষ্য-পোষক সম্পর্কের কথা আগেই বলা হয়েছে। পোষ্য-পোষক সম্পর্কের অনিবার্য ফল হিসেবে এখানে ‘মানি ও মাসেল’-এর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় সংসদের ওপর পরিচালিত সমীক্ষায় ক্রমেই রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণ প্রবণতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ‘রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন’ও ঘটেছে। যেহেতু এক দশকেরও বেশি সময় আওয়ামী লীগ শাসনক্ষমতায় রয়েছে। সুতরাং এসব বিশেষণের সবটুকু না হলেও প্রধান অংশের দায় তাদের ওপরই বর্তায়। ক্ষমতাসীন দল হিসেবে সমাগত কাউন্সিল অধিবেশন নিয়ে মানুষের তীক্ষè দৃষ্টি রয়েছে। মানুষ চায় সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সৎ, সাহসী ও নীতিবান মানুষ গোষ্ঠীতন্ত্রের বেড়াজাল ভেদ করে গণতন্ত্রের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হোক।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com

ভাগ