আশায় বসতি : সার্চ কমিটি

0

ড. মাহবুব হাসান
‘আশায় বসতি’ লিখে এবং প্রকাশ করে কবি আহসান হাবীব আমাদের হৃদয় জয় করেছিলেন গত শতকের সাতের দশকে। তখন আমরা বয়সে তরুণ আর হাবীব ভাই পঞ্চাশোর্ধ্ব, চার-এর দশকের কবি। তিনি যে দূরদৃষ্টি অর্জন করেছিলেন আজ বুঝতে পারি। মানুষ যে আশায় বসবাস করে এই চিরসত্য তিনি বুঝেছিলেন। আজ আমরা বুঝছি আশা ছাড়া আমাদের আর কোনো সম্পদ নেই। সাহস নামের একটি সম্পদ আমাদের ছিল পাকিস্তানি শাসনামলে, তা কোথায় যে গিয়ে সেঁধিয়েছে, আল্লাহ মালুম। সার্চ কমিটি নিয়ে ঢাকার মিডিয়াগুলো বেশ তৎপর, বলব কিছু ইতিবাচকও তারা। আমি নিজেও ওইসব টিভি টকশোতে অংশ নিয়েছি। সরকারি দলের যারা যোগ দেন তাদের কথা একটাই, আইন করার দাবি করা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ সে দাবি পূরণ করেছে। সেই আইন অনুযায়ী সার্চ কমিটি গঠিত হয়েছে। আইনটি যে একটা সার্চ কমিটি নিয়োগ দেয়ার জন্যই করা হয়েছে, সেটি তারা বলেছেনও তা। কিন্তু এটি বলেননি যে, আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতির মহামান্যতার সাধে মানানসই কোনো ক্ষমতা নেই। সংবিধানে তাকে দু’টি দায়িত্ব দেয়া হয়েছে- এক. প্রধান বিচারপতি ও প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষমতা। এর বাইরে যা কিছু তিনি করবেন বা করতে যাবেন, তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতে তিনি বাধ্য। যেমন- এই যে সার্চ কমিটি গঠিত হয়েছে যে কয়জন ভদ্রলোক কমিটির সমস্য হয়েছেন রাষ্ট্রপতি তাদের নিয়োগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তাদের নিয়োগ অনুমোদন করার পর। এই সার্চ কমিটির সদস্যরা দলনিরপেক্ষ যে ১০-১২ জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করবেন, তাদের নাম প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের পরই রাষ্ট্রপতি তাদেরকে পরবর্তী নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেবেন। তার মানে, প্রধানমন্ত্রী যাদের নাম প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনার হিসেবে চূড়ান্ত করে দেবেন, তারাই হবেন পরবর্তী কমিশনের ক্ষমতাবান সদস্য।
এই প্রক্রিয়াটি খুবই সোজা ও সহজ। এতে কোনোরকম প্যাঁচ নেই। কোনো রকম দলীয়করণের কোনো পথও নেই। কেবল প্রধানমন্ত্রী যাদেরকে কমিশনে নিতে বলবেন, রাষ্ট্রের এক নম্বর নাগরিক মহামান্য রাষ্ট্রপতি তাদেরই নিয়োগ দেবেন। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি বেরিয়ে যাবে হুদা কমিশন আর ইন করবেন নতুন কমিশনাররা। তারাই পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য এ দেশের গণতান্ত্রিক ধারার নির্বাচন কনডাক্ট করবেন। এখানে বলে রাখা দরকার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন কিভাবে সংবিধানের কাটা-ছেঁড়ার ভেতর দিয়ে সংবিধানের আরেকটি প্রতিষ্ঠান প্রশাসনের রাজনৈতিক সরকারের অধীনস্থ হয়, তা লক্ষ করুন। এখানে রাষ্ট্রপতির বলার কোনো এখতিয়ারই নেই যে, তিনি বলতে পারেন, আমি রাষ্ট্রের এক নম্বর ব্যক্তি, আমিই নিয়োগ দেবো। হ্যাঁ, নিয়োগ দেবেন ঠিকই, সেটাই রেওয়াজ। কিন্তু মাঝখানে একটি ক্ষমতার কাঁটা আছে। সেটি তাকে অক্ষম করে রেখেছে। যাক, এসব রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিধি-বিধানের চোরাস্রোত। আসলে তা চোরা নয়, প্রকাশ্যই। আমরা বরং একে লুকিয়ে রাখতে চাই, যাতে সংবিধানের ওই লোভী ও অনৈতিক ক্ষতটি কারো চোখে না পড়ে। যিনি বা যারা সংবিধান কেটে-ছেঁটে ওই বিধান সংযোজন করেছিলেন তাদের হীনতা, গণতন্ত্রের প্রতি ঘৃণা ও ক্ষমতার লোভ যে কতটা অসীম, তা সহজেই বোঝা যায়। এসব বুঝতে বুঝতেই আমরা দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করে ফেলেছি। কিন্তু নিজেদের বিবেকে একটিও পিঁপড়ের কামড় অনুভব করিনি। আহা, কী সহনশীল আমাদের চেতনা, কী নির্মম আমাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
২. আমরা মনে করি, সার্চ কমিটি যাদের নিরপেক্ষ ও যোগ্য বিবেচনা করে খুঁজে নেবে এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে কমিশনে বসবেন, তারা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই করবেন, তাতে কোনো ভুল নেই। কারণ তাদের মনে ও চেতনায় এটাই থাকবে যে, তারা প্রধানমন্ত্রীর লোক এবং তাদের নিয়োগদাতাও তিনিই (পরোক্ষে)। তাদের পক্ষে ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো অনিরপেক্ষ নির্বাচনী ফল ঘোষণা করা সম্ভব হবে না। তাদের কাজই হবে সরকারকে সার্ভ করা। যেহেতু তারা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কমিশনার, তাই তাদের প্রটেকশন দেবে সরকার। আসলে নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠাকাল থেকে গত ৫০ বছরেও কেন স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলা হলো না-হয়নি, তার পেছনে যে রাজনৈতিক অভিসন্ধি ছিল-রয়েছে, তাকে কী বলে চিত্রিত করবেন? নির্বাচন কমিশনের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সেক্রেটারিয়েট হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি বলেই সরকারের প্রশাসনের লোকদের ভাড়া করে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হচ্ছে। আর কে না জানে, প্রশাসনের জেলা স্তরের লোকেরা রাজনৈতিক সরকারের বশংবদ কর্মকর্তা, তারা সরকারকেই সেবা দেবে। পুলিশ যেমন, তেমনি জেলাস্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা (ডিসি-এডিসি-ইউএনও এবং আরো যারা সরকারি কর্মী) সরকারের সেবা দিতে অভ্যস্ত। তাদের মনে-মননে ও রক্তে মিশে আছে সরকারকে সেবাদানের মানবিক ও নৈতিক প্রবাহ। আর এই প্রবাহের সূচনা করেছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার, যারা মনে করত এ দেশের জনগণ তাদের প্রজা। আর তারা ছিলেন রাজা। আজকের সরকারও সেটাই মনে করে। এ কারণেই কি দেশটি মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা পেলেও রাজনীতিকরা এর নামের সাথে প্রজাতন্ত্র যোগ করেছেন। কেন তারা প্রজাতন্ত্র যোগ করলেন, তার মনস্তাত্তি¡ক কারণ কী? কেন তারা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ (ডেমোক্র্যাটিক বাংলাদেশ) নাম রাখলেন না, সেটাও বিবেচনায় রাখতে হবে । নির্বাচন কমিশনারদের নির্দেশ তারা শুনবেন না। বিগত নির্বাচনগুলো তার রাজসাক্ষী। এ বিষয় নিয়ে বহুবারই লেখালেখি হয়েছে এবং হচ্ছে। যতদিন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন সচিবালয় পুরোপুরি লোকবল নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারবে ততদিন পর্যন্ত নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ, অবাধ হবে না। যখন থেকে নিজেদের জনবল দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারবে তখন থেকে সুষ্ঠু অবাধ, নিরপেক্ষ জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অবাধ, রিগিংবিহীন করা সম্ভব। এভাবে কমিশনকে শক্তিশালী করা না গেলে পুলিশি সহায়তায় রাতের বেলায় ব্যালটে সিল মারার উৎসব, রাজনৈতিক সরকারের প্রশাসনের কর্তৃত্ব বিলোপ করা যাবে না।
সংবিধানে নির্বাচনী আইন করার যে বিধান রাখা হয়েছে, তার লক্ষ্য ছিল কমিশনকে পরিপূর্ণতা দান। সেটা তো হয়নি। এখন আওয়ামী লীগ সরকার একটি নির্বাচনী আইনের তাস মেলে দিয়ে সার্চ কমিটি করেছে, যাতে নিজেদের চিহ্নিত লোককে কমিশনে বসিয়ে জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া যায়। একে যাই বলা হোক না কেন, গণতান্ত্রিক চেতনা বা গণতন্ত্রের প্রতি কমিটমেন্ট বলা যায় না। রাজনীতিকদের প্রকৃত গণতন্ত্রে ফিরতে হবে, যেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের অভিসন্ধি থাকবে না নির্বাচনী কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার। ধরুন, সরকার এমন একটি নির্বাচনী আইন করেছে যেখানে সব ক্ষমতাই নির্বাচনী কমিশনের একচ্ছত্র। তারপরও কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারবে না। কারণ তাকে লোকবল হায়ার করতে হবে রাজনৈতিক সরকারের প্রশাসন থেকে। তারা যে প্রশাসনের অধীন, তাতে তারা কোনোভাবেই তাদের নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে যাবেন না। কারণ তাকে, তাদেরকে নির্বাচনের পরই ফিরে আসতে হবে প্রশাসনে, তার পূর্বপদে। নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্রীয় সচিবালয় থেকে উপজেলা স্তরে, ইউনিয়ন স্তরে নির্বাচন অফিস খোলা ও লোক নিয়োগ করে নির্বাচন কনডাক্ট করতে হলে চাই কিছু সময়, যা আমাদের হাতে নেই। কেবল লোকবল আর অফিস খুললেই তো হবে না, সেই সব জনবলের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ এটি। প্রশাসনিক স্ট্রাকচারের মতোই নির্বাচন কমিশনের স্ট্রাকচারও একইভাবে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য বড় আকারের অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন। সরকার কি সেই দায়িত্ব পালন করবে? নাকি নির্বাচন কমিশনই তাদের প্রশাসনিক ব্যয়-বরাদ্দের বাজেট প্রতি বছর সরকারের মতোই জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করে তা পাস করিয়ে নেবে। সাংবিধানের সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। যেমন- নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসনিক বিভাগ ও আরো যেসব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যেমন- দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উন্নয়নের পরই কেবল আমরা বলতে পারব, আমরা গণতান্ত্রিক চেতনার ধারক এবং আমরা নিজেদের গণতান্ত্রিকতায় বিশ্বাসী ও তার চর্চাকারী। গণতন্ত্র মুখে বলার জিনিস নয়, তা প্র্যাক্টিসের ভেতর দিয়ে প্রমাণ করতে হয়, করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা যাবে যদি তাদের সচিবালয় থেকে জেলা ও উপজেলা স্তরে বিচার বিভাগের লোকবল নিয়োগ পায়। এখন তো প্রশাসনের ছোট আমলারা উপজেলা, জেলা স্তরে নিজেদের বিচারক হিসেবে প্রমাণ করেন। কারণ রাজনৈতিক সরকারের প্রশাসন কাঠামোর লোকেরাই জেলা ও উপজেলায় বিচার বিভাগের বিচারক হিসেবে কাজ করেন। এভাবেই চলে আসছে আমাদের শাসন ও ত্রাসন। আপনি দেশকে ভালোবাসেন। কারণ আপনি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। কিন্তু সরকার সেটা মনে করে না। তারা মনে করে তাদের তালিকায় যাদের নাম আছে তারাই মুক্তিযোদ্ধা। এই মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নিয়ে যে কত অন্যায়, অবৈধ কাজ হয়েছে তা আমরা পত্রিকায় পড়েছি। তার কারণ ওই মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটকে লাভজনক করে তোলা হয়েছে। যারা সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধা, যারা জীবন দান করেছেন, তারা কোনো লাভের আশায় যুদ্ধ করেননি। তারা যুদ্ধ করেছেন দেশকে হানাদারমুক্ত করতে, দেশের স্বাধীনতার জন্যই তারা যুদ্ধ করেছেন। আমরা চাই দেশের সেই সব সূর্যসন্তানদের আর যেন কণ্টকিত করা না হয় দলীয় চিন্তার বৃত্তে এনে। রাষ্ট্রক্ষমতার লোভে নির্বাচন কমিশনকে এমন বামনাকৃতি করে না রেখে এর সমৃদ্ধি ও পরিপূর্ণতা দেয়াই হোক রাজনৈতিক সরকারের প্রধান কাজ। তাহলে আর নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা উঠবে না। আর নির্বাচন কমিশনও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। পালন করবে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব-কর্তব্যের সব কিছু। কেন না, সরকারের দিক থেকে সেই কমিশনের ওপর কোনো রকম রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ থাকবে না। আমরা এটাই চাই।

Lab Scan