আরিফের বাসায় বৈঠক, তোলপাড়

নতুন আহ্বায়ক কমিটিকে ঘিরে সিলেট বিএনপিতে চলছে নানা জল্পনা। সিনিয়র নেতাদের মধ্যে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ। কিন্তু মুখ ফুটে কেউ কিছু বলছেন না। দলের দুর্দিন এবং টিকে থাকার লড়াইয়ের পথ খুঁজছেন অনেকেই। এই অবস্থায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আভির্ভূত হয়েছেন সিলেটের বিএনপি দলীয় মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। ক্ষুব্ধ নেতাদের নিয়ে নিজের কুমারপাড়াস্থ বাসায়ই করলেন বৈঠক। আর এই বৈঠকে তিনি নিজেও খুঁজলেন সমাধানের পথ। সবার কথাও শুনলেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে ওই বৈঠকে উপস্থিত হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক দিলদার হোসেন সেলিম, কেন্দ্রীয় সহ-ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ক সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক ও কেন্দ্রীয় সদস্য ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরীও। শনিবার রাতে মেয়র আরিফের বাসার বৈঠকে অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন। আর রাতে এই বৈঠক নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। নানা গুজবের ডালপালা ছড়ায় এই বৈঠক। কারণ বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের বেশির ভাগই ছিলেন ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা। বিভিন্ন সময় সংকটে, দুঃসময়ে তারা বিএনপির হাল ধরেছিলেন।
কিন্তু আহবায়ক কমিটি গঠনের পর তারা ‘রহস্যময়’ ভাবে নীরব হয়ে পড়েছেন। বৈঠকে থাকা কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন- মেয়রের বাসার বৈঠক বিএনপির কোনো ‘বিদ্রোহী’ গ্রুপের বৈঠক নয়। বৈঠকটি ছিলো মূলত পর্যালোচনামূলক। কারণ- যে আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে সেটি দেখে সিলেটের বেশির ভাগ সিনিয়র নেতা অবাক হয়েছেন। বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরে আরিফুল হক চৌধুরীর বাসায় বৈঠকে বসা হয়। আর এই বৈঠকে সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। তারা জানান- বৈঠকে সিলেট জেলা বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেক নেতা। অভিযোগ করে বলেন- নতুন আহবায়ক কমিটিতে অনেক সিনিয়র নেতাকে বাদ দেয়া হয়েছে। কমিটির তালিকা পাঠানোর আগে তাদের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন মনে করা হয়নি। মনগড়া একটি কমিটি অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এ কমিটিতে অনেক বিতর্কিত নেতা রয়েছেন। এসব নেতারা বিভিন্ন সময় দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। আবার নারী কেলেংকারী, ভূমি দখল, জালিয়াতি সহ নানা ঘটনায় সম্পৃক্ত নেতারাও কমিটির অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এতে করে ঘোষিত কমিটি নিয়ে কেউ সন্তুষ্ট হতে পারেননি। বৈঠকে থাকা সিনিয়র এক বিএনপি নেতা মানবজমিনকে জানান- আরিফুল হক চৌধুরীর বাসায় বৈঠক চলার সময় সেখানে উপস্থিত হন বর্তমান আহবায়ক কমিটির সদস্য ইশতিয়াক আহমদ। তিনি গিয়ে কিছু সময় অবস্থান করেন এবং কথাবার্তা শুনেন। এরপর তার উপর আনা অভিযোগের যুক্তি খণ্ডন করে বলেন- ‘উপজেলা নির্বাচনে আহবায়ক কমিটির সদস্য মাজহারুল ইসলাম ডালিমও বিএনপি থেকে অব্যাহতি নিয়ে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে নির্বাচন করেছেন। তিনি কমিটিতে আসতে পারলে আমি কেনো আসতে পারবো না।’ ইশতিয়াক তার বক্তব্য উপস্থাপন করে চলে যান। ইশতিয়াকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি বিগত উপজেলা নির্বাচনে সদর উপজেলায় নৌকার প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে। বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন- এডভোকেট নুরুল হক, আব্দুল কাহির চৌধুরী, আলহাজ্ব মকন মিয়া, ফয়সল আহমদ চৌধুরী, আব্দুশ শহিদ চেয়ারম্যান, মহিউস সুন্নাহ নার্গিস, আরিফ ইকবাল নেহাল সহ অর্ধশতাধিক নেতা। এছাড়া কৃষক দল, শ্রমিক দল ও তাতীদলের সিনিয়র নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। রাতে বাসায় বৈঠক আয়োজনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি মানবজমিনকে জানিয়েছেন- বৈঠকে সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করা হয়েছে। বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিলো- আগামী কমিটিতে সবার যাতে অংশগ্রহণ ও যথাযথ মর্যাদা সুরক্ষিত হয় সে বিষয়টি আমরা দেখভাল করবো।
কোথাও কোনো ব্যাঘাত থাকলে কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা করে সেটি দূর করার চেষ্টা করবো। বৈঠকে থাকা নেতারা দীর্ঘ আলোচনার পর এসব মতামতের সঙ্গেও এক মত হয়েছেন বলে জানান আরিফ। কেন্দ্রীয় সহ-ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ক সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক জানান- আরিফুল হক চৌধুরীর বাসার বৈঠক সিনিয়রদের মতামতের ভিত্তিতেই হয়েছে। বৈঠকে এম এ হকেরও উপস্থিত থাকার কথা ছিলো। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তিনি উপস্থিত হতে পারেননি। আন্দোলনে থাকা বিএনপির নেতা-কর্মীরা কেউ কেউ দীর্ঘ সময় হাজতবাস, অঙ্গহানী ও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু দল থেকে কোনো মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। আহবায়ক কমিটি গঠনের পর তারা আরো মনক্ষুণ্ন হয়ে পড়েছেন। ফলে আমরা তাদের নিয়ে বসেছি। সব বিষয়ে আলোচনার পর আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি- সার্বিক বিষয়টিকে কেন্দ্রকে অবহিত করবো। আগামীতে যাতে সবার অংশ গ্রহণ নিশ্চিত হয় সে বিষয়টিও আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখবো। কোনো লিমিটেড কোম্পানী আমরা মানবো না। আর আহ্বায়ক কমিটি সহযোগিতা চাইলে আমরা সবাই সহযোগিতা করবো।
চার উপদেষ্টার অভিনন্দন: সিলেট জেলা বিএনপির নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের চার উপদেষ্টা তাহসীনা রুশদীর লুনা, আলহাজ্ব এম. এ হক, ড. মোহাম্মদ এনামুল হক চৌধুরী ও খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। গতকাল এক বিবৃতিতে তারা বলেন- সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল সিলেট জেলা বিএনপি। এই কমিটি মেয়াদ শেষ করায় পুনরায় কাউন্সিল করার লক্ষ্যে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস এই কমিটি তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একটি সফল ও সার্থক কাউন্সিল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের আগামী দিনের পনতৃত্ব বাছাই করবে। দলের সকল কার্যক্রমে তাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন তারা। তিন কেন্দ্রীয় নেতার অভিনন্দন: সিলেট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সকল নেতৃবৃন্দকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বিএনপির বিএনপির তিন কেন্দ্রীয় নেতা। ত্যাগী নেতাদের সমন্বয়ে এ কমিটি গঠন করায় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানান তারা। এক বিবৃতিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন, দুই সহ-সাংঠনিক সম্পাদক ও সাবেক এমপি যথাক্রমে দিলদার হোসেন সেলিম ও কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন এ অভিনন্দন জানান।

ভাগ