আরও ঘনীভূত রোহিঙ্গা সংকট

লোকসমাজ ডেস্ক ॥ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে আঞ্চলিক শক্তিধর চীনের মধ্যস্থতাও কোনো কাজে আসছে না। চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিদেশীয় যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, মিয়ানমারের অনাগ্রহে তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে মামলা দায়েরের পর মিয়ানমার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী অপপ্রচারে নেমেছে। এই অপপ্রচার মোকাবিলা এখন কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মামলার প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিয়ানমারের অপকৌশল আরও বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ অধিবেশনের সাইড লাইনে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হয়েছিল। সেখানে জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তিন দেশ মিলে মাঠপর্যায়ে একটি কমিটি হবে এবং তারা প্রত্যাবাসন জটিলতা নিরসনে কাজ করবে। পরে মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক, চীন ও মিয়ানমারের দূত এ তিনজন নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধি হিসেবে তিন সদস্যের কমিটি গঠিত হয়। তাদের মধ্যে এক দফা আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক বৈঠক এবং প্রত্যাবাসন নিয়ে গত মাসের শুরুতেই তাদের ফের বৈঠকে বসার কথা ছিল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওই বৈঠক আয়োজনে প্রস্তুতির কথা চীনের রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে মিয়ানমারকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তা হয়নি মিয়ানমারের অনাগ্রহের কারণে। তারা এখনো বৈঠকে বসতে সম্মতিও দেয়নি। জানা যায়, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে গাম্বিয়ার মামলা এবং আর্জেন্টিনার মানবাধিকার কর্মীদের অন্য একটি মামলার পর মিয়ানমার ব্যাপকভাবে বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচারের কৌশল নিয়েছে। ১৫ নভেম্বর মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির কার্যালয়ের একজন মুখপাত্র সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ সহযোগিতা করেনি এবং দুই দেশের মধ্যে এ-সংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেনি। ওই মুখপাত্র আন্তর্জাতিক আদালতে রাখাইনে গণহত্যা বিচারের মামলার জন্যও কঠোর সমালোচনা করেন। রোহিঙ্গা সংকট ঘিরে নানামুখী রাজনীতির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দায়ী করেন তিনি। ওই সংবাদ সম্মেলনের পর মিয়ানমারের পক্ষ থেকে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে এবং পশ্চিমা বেশ কয়েকটি দেশের দূতাবাসে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। ওই চিঠিতেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ অসহযোগিতা করছে, চুক্তির শর্ত মানছে না- এমন তথ্য দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে নেপিদোতে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকের মাধ্যমেও বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচার চালানো হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রের খবর, আইসিজেতে গাম্বিয়ার মামলার পর মিয়ানমার রোহিঙ্গা ইস্যুতে বেশ বিচলিত হয়ে পড়েছে। কারণ হেগের এই আদালত থেকে গণহত্যার জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে রায় দিলে তা সব সদস্যরাষ্ট্রকে মানতে হবে। এর ফলে আদালতের রায়ে গণহত্যার জন্য কেউ চিহ্নিত হলে এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের রায় হলে ওই ব্যক্তিরা সদস্যরাষ্ট্রগুলোতে ভ্রমণ করতে পারবেন না। আইসিজের কোনো সদস্যরাষ্ট্রে ভ্রমণে গেলেই তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মিয়ানমারের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যচ্ছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক ব্রিফিং এবং সৌজন্য বৈঠকের মাধ্যমে মিয়ানমারের অপপ্রচারের জবাব তুলে ধরা হয়েছে। এ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া অপপ্রচার মোকাবিলায় রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান অবস্থার সঠিক চিত্র তুলে ধরে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশের কাছে প্রচার চালানো হচ্ছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের অপপ্রচার মিয়ানমারের জন্য খুব বেশি লাভজনক হবে না। কারণ রাখাইনে মিয়ানমার বাহিনী কী ধরনের গণহত্যা চালিয়েছে এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিলম্বিত করতে কী ধরনের অপকৌশল নিয়েছে, সেটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে স্পষ্ট। তবে মিয়ানমারের অপপ্রচারের কারণেই বরং রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল হচ্ছে এবং প্রত্যাবাসনও বিলম্বিত হচ্ছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার পরিবর্তে এখন অপপ্রচার মোকাবিলার কূটনীতিতেই বেশি জোর দিতে হচ্ছে। চলিত মাসে ভাসানচরে যাবেন জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা : কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী স্থানান্তরের জন্য ভাসানচর কতটা তৈরি, তা দেখতে জাতিসংঘের একটি প্রতিনিধিদলের চলতি মাসেই সেখানে যাওয়ার কথা রয়েছে। গতকাল এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক এ তথ্য জানান। জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে সরিয়ে নেওয়ার বিরোধিতা করছে কিনা জানতে চাইলে শহীদুল হক বলেন, জাতিসংঘ বেশ কিছুদিন ধরেই বাংলাদেশের সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করছে। এ-সংক্রান্ত জাতিসংঘের একটি কারিগরি দলের খুব শিগগির ভাসানচর যাওয়ার কথা রয়েছে। প্রতিনিধিদলটি সেখানে কিছু বিষয় নিশ্চিত করতে চায়। ওই বিষয়গুলোর সুরাহার পর স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। কাজেই জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পাঠানোর বিরোধিতা করছে এ কথা ঠিক নয়। জাতিসংঘের প্রতিনিধিদল কবে ভাসানচরে যাবে জানতে চাইলে শহীদুল হক বলেন, এ মাসের মধ্যে হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মধ্যে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাদের সফর পিছিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার মামলার ক্ষেত্রে আইনি পরামর্শক সংস্থার মতামত নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, রোহিঙ্গারা যে চলে এসে কেন যাচ্ছে না, সেটা দেখতে হবে। পাশাপাশি তাদের ওপর নৃশংসতার জবাবদিহি ও বিচারের বিষয়গুলোও দেখতে হবে। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জবাবদিহি ও বিচার নিশ্চিত হলে এরা নিজের দেশে ফিরে যাবে। না হলে বারবারই বাংলাদেশে আসবে।
এর সম্ভাব্য মূল কারণ হতে পারে মিয়ানমারের জবাবদিহি আর বিচারের বিষয়টির সুরাহা হয়নি। রোহিঙ্গাদের তাদের দেশের নাগরিকত্বের বিষয়টির সুরাহা হয়নি। শহীদুল হক বলেন, ‘জবাবদিহি ও বিচারের বিষয়ে আমাদের যে অবস্থান, সেটা আইসিসিতে হোক আর আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে হোক, ঠিক ওটারই প্রতিফলন। সেখানে গাম্বিয়ার যে মামলা, ওটা ওআইসির পক্ষ থেকে করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আইসিসি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে আদালতে বিষয়টি তুলেছে। এ বিষয়ে আইসিসি আমাদের মতামত চেয়েছিল। তাদের অনুরোধে আমরা মতামত দিয়েছি। আইসিসি যাতে এখানে কাজ করতে পারে সে জন্য তাদের সঙ্গে আমাদের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। কাজেই এ প্রক্রিয়াগুলোতে আমরা নানাভাবে জড়িত। আন্তর্জাতিকভাবে কোনো আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মতামত নেওয়া হয়েছে কিনা এ প্রসঙ্গে বলতে পারি, এ বিষয়ে বাংলাদেশের যা যা করার আমরা সবই করেছি। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলায় অং সান সু চি তাঁর দেশের পক্ষে কথা বলবেন। ওই আদালতে বাংলাদেশের পক্ষে কে কথা বলবেন জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলাটা করেছে গাম্বিয়া। সুতরাং আদালতে বিষয়টির মোকাবিলা করবেন গাম্বিয়ার প্রতিনিধি। গাম্বিয়া থেকে কে যাচ্ছেন, সেটা যেকোনো কিছুর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের আদালতে বক্তব্য রাখার কোনো সুযোগ নেই। রোহিঙ্গা সমস্যাটি বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করছে। মিয়ানমার যখন দেখবে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে বিষয়টি গড়াচ্ছে, তখন কি দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া ঝুলে যাবে? এ প্রশ্নের উত্তরে শহীদুল হক বলেন, আমাদের নীতি হচ্ছে দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয়। ২০১৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তৃতা দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি তুলেছেন। সুতরাং মিয়ানমার তখন থেকেই জানে আমরা দুই দিক থেকেই বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা করছি। একটা আরেকটার পরিপূরক। বাংলাদেশ প্রত্যাবাসন চায়, নাকি বিচার চায় জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, প্রত্যাবাসন ও বিচার অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এর আগেও প্রত্যাবাসন হয়েছে। তারা গেছে এবং আবার এসেছে। তাদের প্রত্যাবর্তন যেন টেকসই হয়, আর ফিরে না আসে, সে জন্য জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ। জবাবদিহি ও ফিরে যাওয়া একটা আরেকটার পরিপূরক।

ভাগ