‘আম্পান’: বেড়িবাঁধ ভাঙন আতঙ্কে খুলনা উপকূলের ৩ লক্ষাধিক মানুষ

মো.জামাল হোসেন, খুলনা ॥ ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’ ধেয়ে আসার খবরে বেড়িবাঁধ ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে সিডর ও আইলা বিধ্বস্ত খুলনার উপকূলীয় এলাকার ৩ লাধিক মানুষ। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় উপকূলীয় জেলা খুলনায় সর্বত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেলার ৩৬১টি আশ্রয়কেন্দ্র ও বিভিন্ন শিা প্রতিষ্ঠানসহ ৬০৮টি কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। এদিকে, সাইকোন শেল্টারে মানুষকে যাওয়ার আহবান জানিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই মাইকিং করা হচ্ছে। খুলনা জেলার সুন্দরবন সংলগ্ন দাকোপ ও কয়রা উপজেলার চতুর্দিক নদী বেষ্টিত। এ দুই উপকূলীয় এলাকার মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় আইলার পর ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হলেও সেগুলো দীর্ঘমেয়াদি হয়নি। দুর্বল বেড়িবাঁধের কারণে বর্ষা মৌসুমে আবহাওয়া বিরূপ হলে পানির চাপে কোথাও কোথাও ভেঙে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। গ্রীষ্ম মৌসুমেও মাঝে মধ্যে বাঁধ ভেঙে অনেক জায়গা রূপ নেয় জলাবদ্ধতায়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, খুলনা জেলায় ৯৯৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এরমধ্যে বর্তমানে মাত্র ১২ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ। তবে, স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের স্থান আরও বেশি। কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে কয়রা উপজেলায় ২৫ কিলোমিটারের মতো বেড়িবাঁধ জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়েছে। কয়রা সদর ইউপি চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির জানান, উপজেলার কয়রা সদর ইউনিয়ন, দণি বেদকাশি ইউনিয়ন, উত্তর বেদকাশি ইউনিয়ন ও মহারাজপুর ইউনিয়নের কপোতা নদ এবং শাকবাড়িয়া নদীর প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এরমধ্যে কপোতা নদের গোলখালী থেকে দশালিয়া পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার ও শাকবাড়িয়া নদীর আংটিহারা থেকে মহরারাজপুর ইউনিয়নের পোবনা পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে ওই চার ইউনিয়নের ২ লাধিক মানুষ বর্তমানে বেশ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলেই এ চার ইউনিয়নের বিপুল সংখ্যক মানুষের ঘুম হারাম হয়ে যায়। সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড় আম্পানেও একই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়কে নয়, উপকূলের মানুষ জলোচ্ছ্বাসকে বেশি ভয় পায়। দাকোপ উপজেলার তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রণজিৎ কুমার মন্ডল জানান, তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের ঢাকী নদীর বটবুনিয়া বাজার সংলগ্ন ৪০০ মিটার ও কামিনীবাসিয়া গাইনবাড়ি সংলগ্ন ৭০ মিটার বেড়িবাঁধ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ওই দুটি জায়গা ধসে গেলে ৩১ নম্বর পোল্ডার ভেঙে তিলডাঙ্গা ইউনিয়ন, পানখালি ইউনিয়ন ও চালনা পৌরসভার বিশাল এলাকা লবণ পানিতে প্লাবিত হবে। এতে ফসল হানিসহ তিগ্রস্ত হবে লাধিক মানুষ। খুলনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজিজুল হক জোয়ার্দার জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে খুলনা জেলার ৩৬১টি আশ্রয়কেন্দ্র ও বিভিন্ন শিা প্রতিষ্ঠানসহ ৬০৮টি কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবেন। তবে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় উপজেলা দাকোপের ১০৮টি, কয়রার ১১৬টি, পাইকগাছার ৪৫টি ও বটিয়াঘাটার ২৩টিসহ ২৯২টি আশ্রয়কেন্দ্রকে আগেভাগেই প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড়ে তি এড়াতে কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ ও বটিয়াঘাটাসহ বিভিন্ন উপজেলায় রেডক্রিসেন্ট, সিপিপিসহ ৩ হাজার ৫৬০ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। এছাড়া বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) আরো ১ হাজার ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। সুন্দরবন উপকূল সংলগ্ন কয়রা উপজেলা সদরের ইউপি চেয়ারম্যান মো. হুমায়ূন কবির জানান, মাইকিং করে স্থানীয় বাসিন্দাদের আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে। কিন্তু পরিবেশ মোটামুটি স্বাভাবিক থাকায় বেলা ১২টা পর্যন্ত কেউ আশ্রয় কেন্দ্রে যায়নি। তবে, দুপুরের পর থেকে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়া শুরু হবে জানান তিনি। খুলনা জেলা সহকারী আবহাওয়াবিদ আমিরুল আজাদ জানান, মঙ্গলবার বেলা ১২টার আবহাওয়ার বুলেটিন অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’ মোংলা সমুদ্র বন্দর থেকে ৬৯৫ কিলোমিটার দণি ও দণি-পশ্চিমে অবস্থান করছিল। খুলনার আকাশ মেঘলা রয়েছে। গুমোট আবহাওয়া বিরাজ করছে। মাঝেমধ্যে ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার বেগে হালকা দমকা বাতাস বইছে। খুলনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ইতোমধ্যে ৬০৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই মানুষদের আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে করোনায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে উপজেলা প্রশাসনকে দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জরুরি চিকিৎসার জন্য ১১৬টি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট এলাকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটিও বাতিল করা হয়েছে।

ভাগ