আগামী বছরও স্থিতিশীল থাকবে জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক বাজার

লোকসমাজ ডেস্ক।। দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি তেলের বাজার নিম্নমুখী রয়েছে। জ্বালানি তেলের রফতানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক ও ওপেকবহির্ভূত দেশ নিয়ে গঠিত ওপেক প্লাস জোট নিম্নমুখী এ বাজার চাঙ্গা করার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যটির সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে বাজার চাঙ্গা করার যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জোটটি, সেটি খুব তাড়াতাড়ি আশার মুখ দেখছে না বলে আভাস দিচ্ছে ইন্টারন্যাশন্যাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ)। সংস্থাটি বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ ও মজুদ থাকার ফলে আগামী বছরও জ্বালানি তেলের বাজার স্থিতিশীল থাকবে। খবর ব্লুমবার্গ ও রয়টার্স।
জ্বালানি তেলের বাজারে আধিপত্য বিস্তার করতে ওপেক জোটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উত্তোলন বাড়িয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। যে কারণে দেশটির আধিপত্য ঠেকাতে ওপেকের শীর্ষ উৎপাদক দেশ সৌদি আরব ও রাশিয়ার নেতৃত্বে ওপেকবহির্ভূত দেশগুলো নিয়ে ওপেক প্লাস জোট গঠন করা হয়। এ জোটের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী, ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত জোটভুক্ত সদস্য দেশগুলো সম্মিলিতভাবে দৈনিক ১২ লাখ ব্যারেল কম জ্বালানি তেল উত্তোলন করবে। ওপেক প্লাস জোট মনে করে, এর মধ্য দিয়ে সরবরাহ সংকটে বাজার চাঙ্গা হবে। তবে ওপেকের এ প্রয়াসের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এ জোটের বাইরে থাকা যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, নরওয়ে ও গায়ানার মতো শীর্ষ উত্তোলক দেশ।
আইইএ তাদের মাসিক প্রতিবেদনে বলছে, ওপেক প্লাস জোটের বাইরের দেশগুলো আগামী বছর তাদের দৈনিক উত্তোলন ২৩ লাখ ব্যারেল বাড়াবে।
দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনের আইসিইতে জ্বালানি তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম ৬০ ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সৌদি আরামকোর দুটি স্থাপনায় হামলার পর হঠাৎ করে কিছুটা দাম বাড়লেও খুব তাড়াতাড়ি আবার নিম্নমুখী হওয়া শুরু করে বাজার। এছাড়া ইরানের তেল রফতানিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ভেনিজুয়েলা ও ইরাকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণেও কিছুটা দাম বৃদ্ধি পায়। আর মার্কিন-চীন বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনায় সর্বশেষ শনিবার দাম কিছুটা বৃদ্ধি পায়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আদর্শ ওয়েস্ট ট্রেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ডিসেম্বরে সরবরাহ চুক্তিতে ৪০ সেন্ট বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে ৫৭ ডলার ১৭ সেন্টে। এছাড়া জানুয়ারিতে সরবরাহ চুক্তিতে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪৬ সেন্ট বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ ডলার ৭৪ সেন্টে।
প্যারিসভিত্তিক সংস্থা আইইএ বলছে, বর্তমানে জ্বালানি তেলের বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। আর ওপেকবহির্ভূত দেশগুলোর উত্তোলন বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০২০ সালেও বাজার স্থিতিশীল থাকবে। এছাড়া আগামী বছরের প্রথমার্ধে চাহিদার তুলনায় বর্তমানে ওপেকভুক্ত দেশগুলোর দৈনিক উত্তোলন ১৭ লাখ ব্যারেল বেশি। ফলে ওপেকের বাড়তি উত্তোলনও জ্বালানি তেলের উদ্বৃত্ত বাজার তৈরি করবে। তবে আগামী মাসে ওপেক প্লাস জোটের বৈঠকে উত্তোলন আরো কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইইএর প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, আগামী বছর থেকে বৈশ্বিক বাজারে ওপেকভুক্ত দেশগুলোর জ্বালানি তেলের দৈনিক চাহিদা হতে পারে ২ কোটি ৮৯ লাখ ব্যারেল, যা দেশটির বর্তমান উত্তোলনের চেয়ে ১০ লাখ ব্যারেল কম।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র অক্টোবরে জ্বালানি তেলের দৈনিক উত্তোলন ১ লাখ ৪৫ হাজার ব্যারেল বাড়িয়েছে। আইইএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশটির দৈনিক উত্তোলন হবে ১ কোটি ২২ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল। আর আগামী বছর উত্তোলন বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে ১ কোটি ৩২ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল।
যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ওপেকবহির্ভূত আরেক শীর্ষ উৎপাদক দেশ ব্রাজিলের উত্তোলন দ্রুত বৃদ্ধির ফলে আগামী বছর জ্বালানি তেলের বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি করবে দেশটি। এনার্জি অ্যাসপেক্টের হিসাবে, গত আগস্টে ব্রাজিলের উত্তোলন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দৈনিক ৪ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল (বিপিডি) বেড়ে ৩১ লাখ বিপিডিতে দাঁড়িয়েছে, যা দেশটির এ-যাবত্কালের সর্বোচ্চ।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, মার্কিন শেল উৎপাদন ও রফতানি যে হারে বাড়ছে, তাতে ওপেকের একার পক্ষে আর জ্বালানি তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এমন পরিপ্রেক্ষিতে ব্রাজিলকে নিজেদের জোটে যোগ দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ওপেকের শীর্ষ উৎপাদক দেশ ও কার্যত নেতা সৌদি আরব। কিন্তু ব্রাজিল এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। যার ফলে জ্বালানি তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য ওপেকের সামনে আগামী বছরও চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল।

ভাগ