মন্ত্রীর নির্দেশনার পরও যশোরের ৫টি জাতীয় সড়ক চলাচলের উপযোগী করে তোলা হয়নি

আকরামুজ্জামান ॥ মহাজোট সরকারের দ্বিতীয় দফা সরকার গঠনের পর বিগত চার বছরে মন্ত্রী-এমপিদের একাধিকবার নির্দেশনার পরও যশোরের ৫টি জাতীয় সড়ক এখনও চলাচলের উপযোগী করে তোলা হয়নি। জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র এক বছর সময় বাকি। এ সময়ের মধ্যে আদৌ সড়কগুলো সংস্কার হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) যশোর বলছে, বিদায়ী বছরের জুলাই মাসে যশোরে ভারী বৃষ্টিপাত হয়। এতে ৫ টি জাতীয় সড়কসহ দুটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সড়ক ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে কারণে রাস্তাগুলো মেরামত করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। তবে ইটবালু দিয়ে ইতঃপূর্বে চলাচলের ব্যবস্থা করতে জোড়াতালির কাজ চললেও বর্তমান সেটিও বন্ধ রয়েছে। ফলে বেহাল সড়কগুলো দিন দিন আরও ভয়াবহ রুপ নিচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, জাতীয় সড়কগুলোর মধ্যে যশোর-খুলনা, যশোর- বেনাপোল, যশোর-ঝিনাইদহ, যশোর-মাগুরা এবং যশোর-নড়াইল। এছাড়া রাজারহাট, মণিরামপুর, কেশবপুর, চুকনগর কেশবপুর-সরসকাঠি-কলারোয়া সড়ক এবং মনিহার হয়ে খুলনা সড়কগুলো ভেঙে একাকার হয়ে গেছে। এর মধ্যে যশোর-খুলনা মহাসড়ক ৩৮ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে চাঁচড়া মোড়, মুড়লী, রাজঘাট, বসুন্দিয়া, প্রেমবাগ, চেঙ্গুটিয়া ও ভাঙ্গাগেট পর্যন্ত বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসড়ক দিয়ে চলাচল অত্যন্ত ঝুুঁকি হয়ে উঠছে।
যশোর-বেনাপোল সড়কের ৩৮ কিলোমিটারের মধ্যে পুলেরহাট থেকে নাভারণ মোড় পর্যন্ত সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী। সড়কটির এমন অবস্থা যে গাড়ি চলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। যশোর থেকে বেনাপোল যেতে ৪০ মিনিট সময় লাগলেও রাস্তা খারাপের কারণে সময় লাগছে দুই থেকে আড়াই ঘন্টা। এ সড়কটি সংস্কারে দীর্ঘদিন ধরে জোর দাবি চালিয়ে আসছে ব্যবসায়ীরা। যদিও গত সপ্তাহে জেলা প্রশাসনের এক সভায় সড়কটির দুই পাশের শতবর্ষী গাছ কেটে চার লেনে উত্তীর্ণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে কবে নাগাদ কাজ শুরু হবে তা নিয়ে এখনও সন্দিহান অনেকেই।
অন্যদিকে যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের ১৬ কিলোমিটারের মধ্যে ১২ কিলোমিটার সড়ক বিধ্বস্ত। সড়কের পালবাড়ী মোড় থেকে ঝিনাইদহের পাগলা কানাই পর্যন্ত বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। একই অবস্থা যশোর-মাগুরা সড়কের। এই সড়কটির ২২ দশমিক ৫ কিলোমিটার সড়কের সীমাখালী ব্রিজ, পুলেরহাট থেকে লেবুতলা বাজার ও রজনীগন্ধা পাম্প পর্যন্ত ইট-বালি খোয়া উঠে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। পুরো সড়কটি টিনের ছাউনির মতো অবস্থা। মানুষ প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন এ সড়ক দিয়ে যানবাহনে চলাচল করছে।
যশোর-নড়াইল সড়কের ২০ কিলোমিটার সড়কের মণিহার থেকে হামিদপুর অংশের পর থেকে একই অবস্থা বিরাজ করছে। এ সড়কের বাউলিয়া বাজার থেকে শুরু করে চাঁচড়া বাজার পর্যন্ত চলাচলে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সড়কজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য বড় বড় গর্তের
সরেজমিন দেখা গেছে, যশোরÑখুলনা সড়কের মণিহার মোড় থেকে নওয়াপাড়া রাজঘাট পর্যন্ত বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। যে কারণে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি। প্রতিদিনই এ রাস্তা দিয়ে খুলনা, ঢাকা, কুষ্টিয়াসহ আঞ্চলিক রুটের বাস-ট্রাক চলাচল করে। কিন্তু সড়কটি সংস্কারে শুধু কর্তৃপক্ষের আশ্বাস আর মন্ত্রীদের নির্দেশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
ওই রুটে চলাচলকারী ট্রাক চালক শামীম হোসেন জানান, গত কয়েক বছর ধরে শুনে আসছি খুব দ্রুতই সড়কটি সংস্থার হবে। তবে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বরং দিন দিন আরও অবনতি হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুম পেরিয়ে শীতের প্রায় ৫ মাস অতিবাহিত হলেও এখনও সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু হয়নি। ফলে ধারণা করা যাচ্ছে সহসা রাস্তাটি সংস্কার হচ্ছে না।
একই কথা বলেন, বাসচালক জামির হোসেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবেই এ সড়কের বেহালদশা। বর্ষা হলেই পানি দাঁড়িয়ে যায় এ সড়কে। রাস্তার ওপর এমন বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তা পারাপারের সময় গাড়ির নিচে বেধে যায়। তিনি এ অবস্থা থেকে পরিত্রানে দ্রুত কাজ শুরু করার জন্য সওজের প্রতি দাবি জানান।
অন্যদিকে গত কয়েক মাস আগে যশোর-বেনাপোল জাতীয় মহাসড়কের ভাঙা অংশে বিটুমিনের উপর ইট বিছিয়ে যোগাযোগ ঠিক রাখার চেষ্টা করা হলেও সেসব স্থানে আবারও বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। মহাসড়কের যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া, পুলেরহাট ও ঝিকরগাছা উপজেলার সেতুর দুইপাশে আমদানি ও রপ্তানি পণ্যবোঝাই ট্রাক ও যাত্রীবাহী যানবহনের তীব্র যানজটে মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে । এতে দুই দেশের আমদানি রপ্তানি চরমভাবে বিঘœ ঘটছে। অথচ এ সড়কটি সংস্কারে গত কুরবানীর ঈদের আগে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী পদক্ষেপ নিতে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, যশোরাঞ্চলের এ মহাসড়কগুলো সংস্কারের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কয়েক দফা নির্দেশনা দেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। এ মন্ত্রীর নির্দেশনার পর সওজের পক্ষ থেকে রাস্তাগুলো সংস্কারের ব্যাপারে সাংবাদিকদের শুধু আশ্বাসই দেয়া হচ্ছে। উপরন্ত কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
তবে সম্প্রতি যশোর কালেক্টরেট সভাকক্ষে এক সভায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, যশোর-বেনাপোল সড়কের শতবর্ষী ঐতিহাসিক রেইনট্রি শিশু ও কড়াই গাছ কেটেই আন্তর্জাতিক কানেকটিভিটির জন্য বেনাপোল সড়কটি সম্প্রসারণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
যশোর সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্র জানায়, গত বছরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) নির্বাহী কমিটিতে যশোর-খুলনা ও যশোর-বেনাপোল জাতীয় মহাসড়ক সম্প্রসারণ ও টেকসই উন্নয়নের জন্য ৬শ ৫০ কোটি ৪৮ লাখ ৭৩ হাজার টাকার দুটি প্রকল্প পাস করা হয়েছে। প্রকল্প দুটির আওতায় যশোর-বেনাপোল জাতীয় মহাসড়কের (যশোর শহরের দড়াটানা থেকে বেনাপোল চেকপোস্ট) ৩৮ দশমিক ২০০ মিটার পুনর্নিমাণ করা হবে। সড়কটির চার লেনে উন্নীত করারও সিদ্ধান্ত হয়। সভায় ফেব্রুয়ারি মাসে বেনাপোল সড়কের সংস্কার কাজ শুরু হবে বলে জানানো হয়।

ভাগ