মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে জীবননগর থানার ওসি এনামুল হক বেপরোয়া

চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা ॥ বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের নাম ব্যবহার করে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর থানার ওসি এনামুল হক বেপরোয়া কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে সব সময়ই তিনি থাকেন সমালোচনার শীর্ষে। তবে সর্বশেষ তার মাদক ও নারীঘটিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ড প্রকাশ পাওয়ায় তা এখন সমগ্র জেলাজুড়ে তুমুল সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর থানার অফিসার ইনচার্জ এনামুল হকের বিরুদ্ধে গ্রেফতার বাণিজ্য, মাদক ব্যবসায়ী, চোরাকারবারী, নারী কেলেঙ্কারিসহ ঘুষের টাকা না পেয়ে সম্প্রতি স্থানীয় যুবলীগ নেতাকে নারী নির্যাতন মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার প্রমান পাওয়া গেছে।
অভিযোগে জানা যায়, জীবননগর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের সরকারপাড়ার মরহুম হাফিজ উদ্দীনের মেয়ে শাবানার (৩০) সঙ্গে তার আত্মীয় একই পাড়ার মরহুম আব্দুল হামিদের ছেলে ও রায়পুর ইউনিয়ন আওয়ামী যুবলীগকর্মী কবির হোসেন (৩৪) ও রায়পুর বাজারপাড়ার আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে আবু হুরায়রার (৩২) জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে গত শুক্রবার (৫ জানুয়ারি) সকালে ঝগড়া হয়। ওইদিন বিকেলে শাবানা জীবননগর থানায় হাজির হয়ে তাকে মারধর ও শীলতাহানির অভিযোগ তুলে তাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন। এ অভিযোগ পেয়ে ওইদিন রাতেই পুলিশ কবির ও আবু হুরায়রাকে তাদের বাড়ি থেকে আটক করে। এ ঘটনার পর শাবানা তার ভুল বুঝতে পেয়ে সেখানকার স্থানীয় কিছু লোকজন ও তার মা, বড় ভাইসহ শনিবার সকালে থানায় উপস্থিত হয়ে তার দায়ের করা অভিযোগ তুলে নিতে চান। কিন্তু ওসি এনামুল হক শাবানাকে থানার একটি ঘরে আটকে রেখে নতুন করে মনগড়া অভিযোগ লিখে তাতে জোর করে তার স্বাক্ষর নেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এ সময় তাকে তার মা ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে দেয়া হয়নি বলে এ প্রতিবেদককে জানান শাবানা।
এদিকে, তিনি মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলা ও তার আয়েশি জীবন-যাপন এখন এলাকার সর্বত্র আলোচনার খোরাকে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সারাদিনে বাইরে তিনি বের হন খুব কম সময়ের জন্য। সকাল ১১টার দিকে একবার ও সন্ধ্যার পর মাত্র একবারের জন্য থানায় তার অফিস রুমে দেখা যায়। জীবননগরের মানুষ প্রয়োজনীয় কাজে থানায় গিয়ে কখনো ওসি সাহেবকে পেয়েছেন এমন দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। থানার নির্দিষ্ট বাসভবনে বসবাস না করে উপজেলা শহরের রাজনগরে ভাড়া বাসায় ব্যাচেলর হিসেবে বাস করছেন। সেখানে থানার দারোগা নাহিরুলের যোগসাজসে জীবননগরের নামকরা মাদককারবারীরা যাতায়াত করে নিয়মিত। পুলিশ সদস্যরা জানিয়েছেন, ওখানে রাতে নিত্যনতুন মেয়েদের নিয়ে আসা হয় ওসি এনামুল হকের সঙ্গে রাত কাটানোর জন্য। ওই সূত্র আরো জানায়, উপজেলার এক ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে এখানকার সীমান্তবর্তী এলাকার সকল চোরাচালানী ও মাদক কারবারীর সঙ্গে লেনদেন ও ওইসব অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন তিনি। সূত্র আরও জানায়, যারা পূর্বে মাদকব্যবসা কিংবা চোরাচালানীর সঙ্গে জড়িত ছিল, কিন্তু সামাজিক ও পারিবারিক চাপে এখন আর করে না। ওসি এনামুল, এসআই নাহিরুলকে দিয়ে তাদের ধরে এনে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাজা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জীবননগর উপজেলা সীমান্তবর্তী হরিহরনগর, বেনীপুর, মেদিনীপুর, গহেশপুর, নতুনপাড়া, শিংনগর, রাজাপুর, মানিকপুর এলাকায় গড়ে উঠেছে বেশকিছু মাদক স্পট। সেগুলো পরিচালিত হয় ওসি এনামুল হকের প্রত্যক্ষ মদদে। তাছাড়া ওই স্থানগুলোতে তারই মদদে গড়ে উঠেছে বেশকটি বাংলামদের দোকান। এলাকাবাসী জানান, মাদক স্পটগুলো পরিচালনা করে এমন কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীকে প্রায়শই দেখা যায় তার ভাড়া বাড়ির সামনে। জীবননগর প্রেস কাব সদস্যরা উদ্ভট কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক প্রতিবাদের উদ্যোগ নিলে তিনি প্রেস কাবে উপস্থিত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে সে যাত্রা বেঁচে যান। গত ১ জানুয়ারি’১৮ জীবননগর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের মরহুম রহম আলীর ছেলে রমজান আলী (৩০) জীবননগর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন যার নম্বর ০১, তারিখ ০১.০১.২০১৮। ওই মামলা সূত্রে জানা যায়, তার দূর সম্পর্কের বোনাই ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার শংকরপুর গ্রামের গোলাপ মন্ডলের ছেলে হযরত আলী (৪০) ও আব্দুল খালেকের ছেলে শরিফুল ইসলাম (৩৫) বাদী রমজান আলীর বাড়িতে আগে থেকেই আসা-যাওয়ার সুবাদে তার স্ত্রী পারুল খাতুনের দিকে কুদৃষ্টি দেন। এর প্রতিবাদ করলে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তারা ১৬ ডিসেম্বর’১৭ তার বাড়িতে ঢুকে তাকে মারপিট করে নগদ টাকাসহ প্রায় ৩ লাখ টাকার মালামাল লুট করেন। মামলা চলমান থাকা অবস্থায় আসামি হযরত, বাদীর স্ত্রী পারুলকে ফুসলিয়ে নিয়ে নিরুদ্দেশ হন। বাদীর লোকজন খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে পারুলকে ৩ জানুয়ারি’১৮ ঢাকার সাভার থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই মামলার অভিযুক্ত হযরতের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তার কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে ৬ জানুয়ারি’১৮ ওসি এনামুল হক এলাকাবাসীর প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও এসআই নাহিরুলকে দিয়ে পারুলকে নিয়ে এসে আসামি হযরতের হাতে তুলে দিয়েছেন।
জীবননগর থানায় কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পুলিশ সদস্য জানান এনামুল হক, থানার এসআই ও এএসআইদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, কোনো কর্মকর্তা অফিসের বাইরে যাবে না। এছাড়া কোনো মামলাও নেবে না। কেউ যদি বাইরে যায় তার দায়িত্ব তিনি নিজেই বহন করবেন। রুটিন ছাড়া আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যক্রম জীবননগর থানায় নেই। তিনি থানায় পুলিশ সদস্যদের অন্য কাজে ব্যস্ত রাখেন, যেনো মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাচালানীসহ অপরাধীরা নির্বিঘেœ তাদের কাজ করার সুযোগ পায়।
এ বিষয়ে ওসি এনামুল হক তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, ‘তিনি আইনের উর্ধ্বে নন। তদন্ত করে যদি অভিযোগ প্রমানিত হয়, তবে যা শাস্তি হয় তিনি মাথা পেতে নেবেন বলে জানান’। জীবননগর থানার অফিসার ইনচার্জ এনামুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগের ব্যাপারে চুয়াডাঙ্গার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার আব্দুল মোমেন বলেন, স্যার (পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান) পুলিশ সপ্তাহের জন্য ঢাকায় অবস্থান করছেন। ঢাকা থেকে ফেরার পর তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থায় যাবেন।

ভাগ