ব্লু হোয়েল: আয়নায় বন্ধুর মুখ!

আগামী দিনের পৃথিবীতে বোধকরি কেউ কাউকে মানবে না। বিশেষ করে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখিতে পড়তে পারে। প্রচলিত ধারার প্রচার মাধ্যমসমূহ যেমন সংবাদপত্র ও টেলিভিশন অনেকটাই কোণঠানা হয়ে পড়বে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে ঘরে ঘরে তৈরি হবে সংবাদকর্মী। ঘরে বসেই সবাই সবাইকে নসিহত করবে। রাতে ঘুমাতে যাবার আগে হয়তো মনে হলো জাতির উদ্দেশ্যে একটা বার্তা দিতে ভুলে গেছেন। ব্যস বার্তাটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পৌঁছে দিলেন। রাত দুপুরে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। কী করা যায়? এসো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘স্ট্যাটাস স্ট্যাটাস’ খেলি। বন্ধুরা মন ভালো নেই। কী করা যায় বলুন তো। ওমা স্ট্যাটাস লিখতে যত না সময় নিয়েছে তার চেয়ে কম সময়েই আসতে থাকলো বন্ধুদের মন্তব্য। কত কথা, কত পরামর্শ… কেউ হয়তো রসিকতাচ্ছলে পরামর্শ দিয়ে বসলো ঘুম হচ্ছে না? ছাদে উঠে যাও। ছাদের কার্নিশে উঠে হাঁটো… দেখবে এমনিতেই ঘুম এসে যাবে…। কী ভয়ঙ্কর, ভাবুন তো একবার!
বলছিলাম, আগামী দিনের পৃথিবীতে কেউ কাউকে মানবে না। আগামী মানেই তো ভবিষ্যৎ… বেশি দিন বোধকরি অপেক্ষা করতে হবে না। বর্তমান সময়টাই তো ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। কী এক ‘ব্লু হোয়েল’ নিয়ে তোলপাড় গোটা দেশ। এটি একটি মরণঘাতি খেলা। কাজেই এটি নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে যে ধরনের সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি ও সতর্কতা রক্ষা করা প্রয়োজন তার ছিটেফোটাও গুরুত্ব পাচ্ছে না। বরং যার যা মনে হচ্ছে তাই বলে যাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে মরণব্যাধি ব্লু হোয়েল সম্পর্কে বলার জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। কাজেই প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ হবার দৌড়ে আঁটঘাট বেধে নেমেছে সবাই।
একটা ছোট্ট ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। ’৮০-র দশকের মাঝামাঝি ‘নেশা সর্বনাশা নেশা…’ এই শিরোনামে এক প্রবন্ধ প্রতিযোগতিার আয়োজন করা হয়েছিল। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এফ রহমান হলে থাকতাম। হঠাৎ একদিন দেখলাম আমার এক রুমমেট মহাব্যস্ত। প্রায় প্রতি দিনই রাত জেগে কি যেন লিখে। ঘটনার কয়েকদিন পর সে আমাকে হলের গেস্টরুমে ডেকে নিয়ে বলল, ভাই নেশার ওপর আমি একটা প্রবন্ধ লিখেছি। জাতীয় পর্যায়ের একটা প্রতিযোগিতায় পাঠাব। তার আগে প্রবন্ধটা আপনাকে শোনাতে চাই। পড়ব? খুশি হয়ে মাথা নেড়ে সায় দিলাম পড়েন। প্রায় পনের মিনিট ধরে দীর্ঘ প্রবন্ধ পড়লো সে। কেমন হয়েছে তা জানার জন্য আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রবন্ধটিতে অনেক তথ্য উপাত্ত আছে। কিন্তু একটা ব্যাপারে আমি শুরু থেকেই একমত হতে পারছিলাম না তাহলো নেশা অর্থাৎ গাঁজা, চরস, ফেনসিডিল কোথায় কোথায় পাওয়া যায়, কোন নেশা কিভাবে সেবন করতে হয় তার বিশদ বর্ণনা আছে প্রবন্ধটিতে।
বিনীতভাবে বললাম, ভাই আপনার প্রবন্ধে এই চ্যাপ্টারটা না থাকাই ভালো। প্রবন্ধটা নিশ্চয়ই কোথাও প্রকাশ হবে। এতে নেশা করার ব্যাপারে বিপথগামীরা উৎসাহবোধ করবে। ‘আত্মহত্যা মহাপাপ’ একথা বলার পরই আপনি যদি আত্মহত্যা করার কৌশল বাতলে দেন তাহলে তো আত্মহত্যাকেই আপনি উসকে দিবেন। রুমমেট জোর তর্ক শুরু করে দিলেন আমার সাথে। তার বক্তব্য কোথায় কোথায় নেশাদ্রব্য পাওয়া যায় সে তথ্য এই প্রবন্ধে থাকা খুবই জরুরি। কারণ এটাও প্রবন্ধের একটা অংশ। এ বিষয়গুলো প্রবন্ধে উল্লেখ থাকলেই না আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সচেতন হবে। আমার কাজ পুরো বিষয়টা তুলে ধরা। পরবর্তীতে যার যার কাজ সেই সেই করবে…
সেদিন রুমমেটকে কোনোভাবেই বুঝাতে পারিনি। আজও মনে হচ্ছে আমার একই অবস্থা। বার বার আয়নায় নিজেকে দাঁড় করাচ্ছি। আমি কি ব্যাকডেটেড? যারা বলছেন আত্মহত্যা করা মহাপাপ আবার তারাই আত্মহত্যার নানা পথও বাতলে দিচ্ছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে কোনোভাবেই নিজেকে যুক্ত করতে পারছি না। প্রিয় পাঠক, আসুন তো আমরা সকলে মিলে একটি সহজ প্রশ্নের উত্তর খুঁজি। এই যে ‘ব্লু হোয়েল’ নামে মরণঘাতি একটা খেলা আবিস্কৃত হয়েছে। মূলত একাকিত্বে ভোগেন এমন তরুণ-তরুণীরাই নাকি এই খেলার প্রতি আসক্ত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে কথা বলা খুবই জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে স্পর্শকাতর এই বিষয়টি নিয়ে আমরা কিভাবে কথা বলবো? আমাদের কি উচিৎ হবে মরণঘাতি এই খেলা কিভাবে খেলতে হবে তা আগে শেখানো নাকি কিভাবে এই খেলা থেকে নিজেকে রক্ষা করা যাবে সে সম্পর্কে সচেতনতাবোধ তৈরি করা? কোনটি আগে জরুরি? আমার ধারণা এই ভাবনাটি মোটেই গুরুত্ব পাচ্ছে না। দু’দিন আগে রাতে নিউজভিত্তিক একটি টেলিভিশন চ্যানেলে এতদসংক্রান্ত একটি টকশো দেখে যারপর নাই অবাক হয়েছি। শোটিতে ব্লু হোয়েল চর্চাকারী এক যুবককে হাজির করা হয়েছে। সে অবলীলায় ‘ব্লু হোয়েল’ সম্পর্কে বলে যাচ্ছে। তার চেহারায় কোনো অপরাধবোধ নেই। বরং সে বেশ উচ্ছ্বসিত… একই অনুষ্ঠানে কোমলমতি কয়েকজন কিশোর-কিশোরীর সাক্ষাৎকারও প্রচার করা হলো। এক কিশোরের বক্তব্য শুনে শুধু অবাক নয় ভয়ও পেলাম। সে বলছে, আমাদের এক বড় ভাইয়ের কাছ থেকে ব্লু হোয়েল সম্পর্কে জেনেছি। ৫০ ধাপের একটি খেলা। এই খেলার সময় যে মিউজিকটি বাজে সেটি নাকি খুবই জোশের…
প্রিয় পাঠক, ভাবুন এবার প্রচার প্রচারণায় আমাদের সচেতন দৃষ্টিভঙ্গির অবস্থাটি কেমন? ব্লু হোয়েল খেলায় আসক্ত হাসিমুখের এই তরুণকে কোন যুক্তিতে একটি জাতীয় প্রচার মাধ্যমে হাজির করানো হলো? এমন যদি হতো যে সে তার অপরাধ স্বীকার করেছে। সে অনুতপ্ত। তাহলেও একটা যুক্তি দেখানো যেত। অনুষ্ঠানে তাকে মোটেই অনুতপ্ত হতে দেখা যায়নি। বরং সে হাসতে হাসতে বলেছে এটি কোনো ব্যাপার না। অর্থাৎ ব্লু হোয়েল খেলা কোনো আত্মঘাতি বিষয় নয়। এই খেলায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখাই হলো আসল। আমি পেরেছি। কাজেই অন্যরাও পারবে। ভাবুন একবার কী সাংঘাতিক কথা। কোথায় সে অপরাধ স্বীকার করে মাফ চাইবে, অথচ প্রকাশ্যে হেসে হেসে কথা বলছিল। ওহ! মাই গড! ভাবতে পারেন কী এক আত্মঘাতি প্রচারণা। একদিকে বলছি ব্লু হোয়েল আত্মঘাতি খেলার নাম। যারা এই খেলায় মত্ত হবে তাদের মৃত্যু অবধারিত। পাশাপাশি যে এই খেলায় আসক্ত হয়ে উঠেছে তার হাসিমুখের অভিব্যক্তিও প্রচার করছি। শিশুর মুখ দিয়ে বলাচ্ছি ব্লু হোয়েলের মিউজিক খুব জোশের… মরণঘাতি ব্লু হোয়েলের চেয়ে প্রচারণার এই প্রবণতাই কি চরম আত্মঘাতি খেলা নয়?
তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে আমাদের করণীয় কি? আমরা কি কিছুই বলব না? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমতো থেমে নেই। এখন ঘরে ঘরে ইউটিউব চ্যানেল। ঘটনার সূত্রপাত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রচলিত ধারায় প্রচার মাধ্যম বাধ্য হয়ে তা প্রচার করছে। এ অবস্থায় আসলে করণীয় কী? হ্যাঁ করণীয় আছে। শুধু প্রয়োজন সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি। প্রয়োজন পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মাঝে পারিবারিক মেলবন্ধন সৃষ্টি করা। আধুনিকতার নামে আমাদের পরিবারগুলো দিনে দিনে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৩ থেকে ৪ জন। বাবা মা ব্যস্ত। সন্তান একা। ফলে মন্দ চিন্তায় আক্রান্ত হয় অনেকে। একাকিত্ব কাটাতে ফেসবুক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢুকে থাকে সর্বদা।
গোপন জিনিসের প্রতি খুব সহজেই মানুষ আকৃষ্ট হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই গোপন জিনিসের ছড়াছড়িই বেশি। যুগের এই পরিবর্তন রোধ করা যাবে না। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা তো সম্ভব? প্রশ্ন উঠতে পারে সেটা কীভাবে? উত্তর একটাই পারিবারিক মেলবন্ধনই দূর করতে পারে সকল ধরনের অস্থিরতা। ভাবুন তো পরিবারের সকল সদস্য মিলে সকালে নাস্তার টেবিলে বসেন কি? রাতে কি দেখা হয় পরিবারের সকল সদস্যের সাথে? পরিবারের সদস্যদেরকে নিয়ে ঘুরতে বের হন কী? আপনার বাসায় কি পারিবারিক আড্ডা হয়? জানেন কি আপনার আদরের সন্তান প্রতিদিন কোথায় যায়, কার সাথে মিশে? তার বন্ধু কারা? প্রতিদিন আয়নায় নিজেকে দাঁড় করান কী? সেখানে কি পরিবারের সকলকে দেখতে পান? বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দিন প্লিজ… তাহলেই দেখবেন ‘ব্লু হোয়েল’ কেন কোনো মরণ খেলাই আমাদেরকে আক্রান্ত করবে না। ভালো থাকবেন সবাই।
রেজানুর রহমান: নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক; সম্পাদক, আনন্দ আলো।

ভাগ