বিশ্ব ইজতিমা

তবলিগ জামাতের ৫৩তম বিশ্ব ইজতিমার প্রথম পর্ব আজ টঙ্গির তুরাগ নদীর তীরে শুরু হচ্ছে। এ উপলে লাখ লাখ মুসল্লির ইজতিমাস্থলে উপস্থিতি, অবস্থান ও নিরাপত্তাসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিবছর ইজতিমায় জনসমাগম বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেেিত ইতোপূর্বে দেশের ৬৪ জেলাকে দুই ভাগে বা পর্বে বিভক্ত করে ইজতিমার আয়োজন করা হতো। গত বছর তা আরো খ-িত করে ৩২ জেলায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়। এবার দু’ পর্বে ৩২ জেলার মুসল্লিরা ইজতিমায় অংশ নেবেন। প্রথম পর্বে ১৬ জেলার মুসল্লিরা এবং দ্বিতীয় পর্বে ১৬ জেলার মুসল্লিরা অংশ নেবেন। আজ বাদ ফজর আম বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হবে ইজতিমার আনুষ্ঠানিকতা। প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে রোববার। চারদিন পর ১৯ জানুয়ারি শুরু হবে দ্বিতীয় পর্বের ইজতিমা। ২১ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হবে এ পর্বের ইজতিমা। মূলতঃ আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে ইজতিমার সমাবেশটি মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বৃহৎ সমাবেশে পরিণত হলেও এবারের ইজতিমা শুরুর দিনটি শুক্রবার হওয়ায় প্রতিবছরের মত এবারো ইজতিমায় দেশের বৃহত্তম জুমার জামাত অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্ব মুসলিমের বৃহত্তম দাওয়াতি কাফেলায় সমবেত ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের প্রতি রইল আমাদের আন্তরিক সালাম ও মোবারকবাদ।
গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে ভারতের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) চারিত্রিকভাবে বিপর্যস্ত, শিাহীন, ধর্মকর্মহীন মুসলমানদের ইসলামের বুনিয়াদি শিা দিয়ে ঈমানী বলে জাগিয়ে তুলতে দিল্লির পার্শ্ববর্তী মেওয়াত অঞ্চলের ুদ্র জনগোষ্ঠির মধ্যে প্রথম তবলিগের কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। ১৩৪৫ হিজরি সনে হজ পালন করে দেশে ফিরে এসে মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) যে তবলিগি গাশ্ত কার্যক্রম শুরু করেছিলেন তা’ই অবশেষে সর্বভারতীয় রূপ লাভ করে। তবলিগ জামাতের হেডকোয়ার্টার দিল্লিতে অবস্থিত হলেও এর বার্ষিক সম্মেলনের স্থান হিসেবে তৎকালীন পূর্ব বাংলা বা বাংলাদেশকেই নির্বাচিত করা হয়। চল্লিশের দশকে প্রথম বিশ্ব ইজতিমা ঢাকার রমনার কাকরাইল মসজিদে অনুষ্ঠিত হলেও এর ক্রমবর্ধমান প্রসারের ফলে তুরাগ নদী তীরের বর্তমান স্থানটিতে বিশ্ব ইজতিমা শুরু হয় ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। মুসলমান জনগোষ্ঠির বৃহত্তম অংশকে ইসলামের বিশ্বাস ও আক্বিদায় সমৃদ্ধ ও বাস্তব অনুশীলনে অভ্যস্ত করা না গেলে মানব সমাজে ইসলাম সম্মত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়, এই উপলব্ধি থেকেই মাওলানা ইলিয়াস তবলিগ জামাতের সূত্রপাত করেছিলেন। তবলিগ জামায়াতের সুশৃঙ্খল কার্যক্রম ইতোমধ্যেই অর্ধশত বছর পার করে এসেছে। ইসলামের দাওয়াত এবং চলমান বিশ্ববাস্তবতার প্রোপটে তবলিগ জামাতের মুসল্লিদের নতুনভাবে চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাগিদ অস্বীকার করা যায় না। জায়নবাদী ষড়যন্ত্র ও প্রোপাগান্ডায় পশ্চিমা বিশ্ব ইসলাম সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। তাদের এই ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করে দিতে ইসলামের মহান শিা, শান্তি ও প্রগতির সার্বজনীন বাণী সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার কোন বিকল্প নেই। তবলিগ জামাতসহ বিশ্বের সচেতন মুসলমানদের সকলকেই সাধ্যমত এই দায়িত্ব পালন করতে হবে।
সারাবিশ্বের মুসলমানরা এখন কঠিন এক দীর্ঘমেয়াদি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও জঙ্গিবাদী ষড়যন্ত্রসহ নানা ধরনের অপপ্রচার চলছে। বিশ্ব ইজতিমায় প্রতিবছর বাংলাদেশের লাখ লাখ তবলিগ সমর্থক ও তওহিদী জনতার উপস্থিতি ছাড়াও উপমহাদেশসহ সারাবিশ্ব থেকে হাজার হাজার মুসল্লির সমাবেশ ঘটে। এ বৃহত্তম সমাবেশ যেমন বিশ্বময় ইসলামের দাওয়াতি কাজকে বেগবান ও সমন্বিত করতে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে, তেমনি এই বিশ্ব ইজতিমা বাংলাদেশ সম্পর্কে সারাবিশ্বে একটি ইতিবাচক পরিচয় ও ভাব-মর্যাদা গড়ে তোলারও এক বড় সুযোগ এনে দেয়। আমাদেরকে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। লাখ লাখ মুসল্লির সমাগমে মুখরিত দু’পর্বের এই জমায়েতের স্বচ্ছন্দ যাতায়াত, অবস্থান, থাকা-খাওয়া ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপরে জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেনাবাহিনী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, রেলওয়ে, বিদ্যুৎ, ওয়াসা, জনস্বাস্থ্য ও প্রকৌশল বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিভাগ ছাড়াও বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগেও তবলিগ জামাতের খেদমতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখা যায়। বিগত বছরগুলোর মত এবারো সংশ্লিষ্ট সকল প সফলভাবে এই দায়িত্ব পালনে সম হবে, এটাই প্রত্যাশিত। এবার মওলানা সা’দ কান্দলভীর ইজতিমায় অংশ নেয়া নিয়ে যে মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়, অনাকাক্সিত হলেও তার শান্তিপূর্ণ মীমাংসা হয়েছে। মুরব্বীরা দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, মওলানা সা’দ ইজতিমায় অংশ নেবেন না। এটা অবশ্যই স্বস্তিকর খবর। এই ঐতিহ্যবাহী দাওয়াতি সংগঠনটির ঐক্য ও সংহতি অটুট থাক, এটাই সকলে কামনা করে। পরিশেষে বিশ্ব ইজতিমা সফল হোক, এই প্রার্থনা করি।

ভাগ