প্রত্যাশার নতুন বছর

সুন্দর সাহা

শীতের হিমেল পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি। পূর্বাকাশে রক্তিম আভা ছড়িয়ে উঁকি দিয়েছে নতুন বছরের প্রথম সূর্য। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে পূর্বাকাশে উদিত হয়েছে সূূর্য। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে আলো আর আলো। আজকের সকালের সূর্য নিয়ে এসেছে নতুন বারতা। ইংরেজি নতুন বছরের প্রথম দিন আজ। সুস্বাগতম ২০১৮। নানা প্রাপ্তি আর ব্যর্থতার সাী হয়ে মহাকালের অতল গর্ভে বিদায় নিয়েছে ২০১৭ সাল। আজ নববর্ষ। নতুন বছর মানেই নতুন উদ্দীপনা, নতুন প্রেরণা নিয়ে এগিয়ে চলা। শুরু হলো খ্রিস্টীয় ২০১৮ সালের পরিক্রমা। বিগত বছরের নানা ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন স্বপ্নে জীবন সাজানোর প্রত্যাশায় বুক বেঁধেছে গোটা জাতি। উন্নয়নের সিড়িতে দেশকে আরও একধাপ এগিয়ে নিতে উম্মুখ দেশ গড়ার কারিগররা। তবে নতুন বছরে অর্থনীতি নিয়ে অনেক প্রত্যাশা থাকলেও রাজনীতিতে আছে নানা শঙ্কা। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নতুন বছরে মতাসীনদের সঙ্গে মুখোমুখি হতে পারে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। এমনিতেই রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতায় থমকে গেছে দেশের অগ্রযাত্রা। তাই নতুন বছরের সবারই আকাঙ্া-কাটুক রাজনীতির গুমোট, সচল হোক অর্থনীতির চাকা। বাড়ুক গণতন্ত্রের চর্চা, কেটে যাক সম্প্রদায়িক নির্যাতনের ষড়যন্ত্র ও জঙ্গি তৎপরতা। সুস্থ রাজনৈতিক পরিমন্ডলে সমৃদ্ধ হোক বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে সংসদ নির্বাচেেক ঘিরে প্রধান দু’দলের মধ্যে রেষারেষি শুরু হয়েছে। কী হতে যাচ্ছে রাজনীতির মাঠে- তা নিয়ে সাধারণ মানুষও সংশয়ে রয়েছেন।
চেতনায় জাগ্রত আবহমান সেই মাঙ্গলিক বোধ অতীতের জীর্ণতা অতিক্রান্ত দিন-মাস-পঞ্জির হিসাব থাক বিস্মৃতির কালগর্ভে; প্রত্যাশায় বুক বাঁধি নতুন দিনের সূর্যালোকে তবে উদ্ভাসন হোক সজীব-সবুজ নতুনতর সেই দিনের, যা মুছে দেবে অপ্রাপ্তির বেদনা, জাগাবে নতুন প্রত্যয়ে নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাবার প্রেরণা। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবে যার উদ্ভাসন সেই স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্রে এটাই তো স্বাভাবিক প্রত্যাশা। চাওয়া-পাওয়ার হিসাব কিংবা প্রত্যাশা-প্রাপ্তির যোগ-বিয়োগ কষতে গিয়ে সব সময় যে মন প্রসন্নতায় আলোকিত হয় এমন ত নয়। তবু যা পেয়েছি সেইটেই বড় করে দেখা। এবং সেখানটাতেই জীবনের গতি, সমাজের অগ্রসরতার চাকা ঘূর্ণায়মান। তাই যা পাইনি, তার হিসাব থাক, যা পেতে চাইছি নতুন বছরের কাছে সেই স্বপ্নটাই রঙিন হয়ে উঠুক আমাদের জীবনে। বাংলায় আমাদের একটি নিজস্ব বর্ষপঞ্জি রয়েছে। আমাদের কৃষিপ্রধান ষড়ঋতুর দেশে চাষাবাদ ও ঋতুপরিক্রমার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই বছরের শুরু হয় বৈশাখে। সে অর্থে বাঙালিজীবনে নতুন বছর বরণের আমজনতার যে বিপুল উৎসব, তা পালিত হয় পহেলা বৈশাখেই। ওই বর্ষবরণ উৎসব পরিণত হয়েছে বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান উপাদানে। আধুনিক মানুষের জীবনযাত্রা নির্বাহের বহুমুখী কার্যক্রম কেবল দেশের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। সে কারণেই বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে যোগাযোগ, আদান-প্রদানের নিমিত্তে একটি বৈশ্বিক দিনপঞ্জিকা অনুসরণ। তাই অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশের গ্রেগরিয়ান বর্ষপরিক্রমা অনুসৃত হয়।
প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার প্রয়োজনে গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করায় বছর শেষে যেমন বিগত দিনগুলোর হিসাব-নিকাশ, ঘটনাপঞ্জির স্মরণে সালতামামির বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পায়, তেমনই নতুন বছরের কর্মপরিকল্পনাও করতে হয়। যোগাযোগ মাধ্যমের অভূতপূর্ব উন্নয়নের ফলে সারা বিশ্ব এখন এক বিশাল অভিন্ন গ্রামে রূপান্তরিত। নানা দেশ ও জাতির সংস্কৃতির একটি মিথস্ক্রিয়ার প্রক্রিয়া ক্রমান্বয়েই প্রবল হয়ে উঠছে। ভালো কি মন্দ-সে প্রশ্ন ভিন্ন। তবে আমরাও এর প্রভাবমুক্ত নই।
নতুন বছরে প্রিয়জনদের শুভেচ্ছা জানিয়ে সুদৃশ্য কার্ড পাঠানোর রীতি বহু দিনের। সমপ্রতি মুঠোফোনের প্রচলন সুবিস্তৃত হওয়ায় দোকান থেকে কার্ড কিনে ডাকঘরে গিয়ে তা পাঠানোর প্রক্রিয়া এই ব্যতিব্যস্ততার যুগে অনেকের কাছেই ঝামেলাপূর্ণ মনে হয়। তাদের কাছে এর চেয়ে সহজ মুঠোফোনের বোতাম চেপে নববর্ষের খুদে বার্তা পাঠানো। বছরের শেষ দিন থেকে মুঠোফোন থেকে মুঠোফোনে এমন অসংখ্য খুদে বার্তা চালাচালি এখন জনপ্রিয়।
নতুন বছরে দেশবাসীর বুকজুড়ে প্রত্যাশা-জঙ্গিবাদের সমূল উৎপাটন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, প্রত্যাশা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও মূল্যস্ফীতি হ্রাসসহ অর্থনৈতিক দূরাবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর অফুরন্ত শক্তি। নতুন বছরের সূর্যের আলো এসব প্রত্যাশা পূরণের নিয়ামক হয়ে উঠুক, জ্বলে উঠুক শুভবোধের আলো, মঙ্গল ও কল্যাণের আলো। আগামী দিনের প্রত্যাশা, নতুন বছরে যেন কাউকে লিখতে না হয় নেতিবাচক কোনো ঘটনা। সরকারের দলীয়করণ আর ব্যর্থতার দিকে কেউ যেন আঙুল তুলতে না পারে। কারো যেন মৃত্যু না হয় কোনো গুপ্তঘাতকের হাতে।
বিভিন্ন স্থানে হিন্দুপল্লীতে হামলা, বাড়িতে আগুন দেয়ার মতো ঘটনা ােভের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আশা করে, এসব হীন কাজের সঙ্গে যারা জড়িত, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের শাস্তি দেয়া হোক। তাহলেই একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আরও এগিয়ে যার আমরা। নতুন বছরের শুরুতেই গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কথা শোনা যাচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়লেও সাধারণ মানুষের আয় সেভাবে বাড়েনি। এ অবস্থায় যদি আবার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ে তাহলে সাধারণ জনগণের নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা হবে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য করতে গিয়ে আরও হিমশিম খেতে হবে তাদের। এর বাইরে নানা েেত্র দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, অগণতান্ত্রিক আচরণের করাল গ্রাস আগ্রাসী হয়ে বসে আছে। রাতারাতি অবস্থা পাল্টে ফেলা না গেলেও দেশের উন্নতির স্বার্থে এসব প্রতিরোধ জরুরি হয়ে পড়েছে। নতুন বছর ২০১৮ বাংলাদেশের মানুষের জন্য নতুন স্বপ্ন বয়ে নিয়ে এসেছে। সবাই আশা করছেন, প্রার্থনা করছেন, যেন বছরটি সবার ভালো যায়। পেছনে ফেলে আসা দুঃখ-কষ্ট ভুলে নতুন করে এগিয়ে যেতে চান সব শ্রেণী-পেশার মানুষ। চান সাফল্য, স্বস্তি। প্রতিবছর পহেলা জানুয়ারি আসে যেমন আসে পহেলা বৈশাখ। এ দুটি বিশেষ দিনকেই আমরা বরণ করে নিই। একটির মধ্যে নিহিত রয়েছে আন্তর্জাতিকতা, অন্যটি আবহমান বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে ধারণ করে বাঙালি হৃদয়ে আবর্তিত হয়। নতুন বছরে নতুন দিন আসে, আমরা জাগ্রত হই। নতুন জীবনের জয়গান গেয়ে অন্তত ওই দিন উজ্জীবিত হই। উল্লাসেও ফেটে পড়ি। আনন্দ-উল্লাসের পাশাপাশি আমরা অঙ্গীকার করি, নতুন বছরে নতুনভাবে চলতে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গীকারের মধ্যে প্রধান হয়ে ওঠে। ব্যক্তিচরিত্র বদলেরও অঙ্গীকার করি আমরা। এসবই বিগত বছরের ভুলত্রুটি শুধরে নিয়ে নতুনভাবে, স্বচ্ছ ও সঠিকভাবে পথচলার অঙ্গীকার। প্রাসঙ্গিক কারণেই প্রশ্ন ওঠে, আমরা কি আমাদের ব্যক্তিচরিত্র ঠিক করতে পারছি? আর ব্যক্তিচরিত্র ঠিক না হলে জাতীয় চরিত্র কীভাবে ঠিক হবে। নতুন বছরে দেশের প্রতিটি মানুষের জীবন সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক, দেশ ও জাতির সুনাম আন্তর্জাতিক পরিম-লে আরও বিস্তার লাভ করুক এ প্রত্যাশা আমাদের। আমরা চাই বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যাশা, আবেগ ও অনুভূতিকে যথাযথ মূল্যায়ন করে দেশটির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন ও রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনতে সর্বাধিক গুরুত্ব দেবে। আমরা গণতন্ত্র বিকাশ ও প্রতিষ্ঠার কথা মুখে বলে বলে ফেনা তুলি, কিন্তু গণতন্ত্রচর্চা করি না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি গণতন্ত্রচর্চায় বলিষ্ঠ ভূমিকা না থাকে, তবে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে কী করে। প্রত্যাশা করি, নতুন বছর হোক গণতন্ত্রচর্চার। দেশ ও জাতির মঙ্গলে তাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত দেশপ্রেম জাগ্রত হোক, খুলে যাক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। এটাই হোক নতুন বছরের প্রত্যাশা। দেশের ১৬ কোটি মানুষ যেন গেয়ে যেতে পারে গণতন্ত্রের জয়গান। শুভ নববর্ষ।

ভাগ