পুরুষদের ডায়াবেটিসের ৯ লক্ষণ

বর্তমান সময়ের ক্রমবর্ধমান রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ডায়াবেটিস। ছোট-বড় সবার ভীতির কারণ এই রোগটি। যুক্তরাষ্ট্রের ৮৬ মিলিয়নের বেশি মানুষ ডায়াবেটিসের প্রাথমিক স্তরে আক্রান্ত এবং তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশের এ ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই। ডায়াবেটিসের প্রাথমিক অবস্থা ধীরে ধীরে টাইপ২ ডায়াবেটিস সহ হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকির কারণ। এ প্রতিবেদনে পুরুষদের ডায়াবেটিসের ৯টি লক্ষণ প্রকাশ করা হলো, যা সতর্ক করছে আপনার রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ছে। এসব লক্ষণ উপেক্ষা করা উচিত হবে না।
* ইরেকটাইল ডিসফাংশন
রক্তে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকলে স্নায়ুকোষ ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাই আপনার পারফরম্যান্স কমে যাওয়ার কারণ হতে পারে ডায়াবেটিস। জার্নাল অব ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল রিসার্চে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, মেটাবলিক সমস্যায় ভোগা ৮৯ শতাংশ মানুষের ইরেকটাইল ডিসফাংশন (লিঙ্গ উত্থানজনিত সমস্যা) দেখা যায়। এটাকে ডায়াবেটিসের প্রাথমিক সতর্কতা উল্লেখ্য করে নিউ ইয়র্ক সিটির সেন্ট জোসেফ কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মার্গারেট ইকের্ট নর্টন বলেন, ‘কোনো পুরুষের এমন সমস্যা হয়েছে বুঝতে পারলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। ডায়াবেটিস এবং উত্থান সমস্যা- উভয়েরই কার্যকরী চিকিৎসা রয়েছে, তাই সংশয় না করে চিকিৎসা নেয়া জরুরি।’
* ইস্ট ইনফেকশন
এটা পুরুষদের ডায়াবেটিসের অন্যতম আরেকটি লক্ষণ, যেটি সম্পর্কে হয়তো তারা ভাবেন না। রক্তে উচ্চ শর্করা গোপন অঙ্গে ইস্ট অর্থাৎ ফাঙ্গাস সৃষ্টি করে এবং তা বাড়িয়ে দেয়। ডা. নর্টন বলেন, ‘এটি একই ধরনের ইস্ট ইনফেকশন যা সচরাচর নারীদের মধ্যে দেখা দেয়। তবে অবশ্যই অবস্থানগত পার্থক্য রয়েছে।’ নর্টন বলেন, পুরুষের এই ইনফেকশন হতে পারে পেনিসের ওপরিভাগে, বিশেষ করে যদি খতনা না করা থাকে।
* ঘন ঘন প্রসাব
ঘন ঘন প্রসাব ডায়াবেটিসের অন্যতম লক্ষণ। আপনি হয়তো দিনের বেলায় লক্ষ করছেন না কিন্তু রাতের বেলায় ঘনঘন প্রসাব হচ্ছে- তাহলে তা ডায়াবেটিসের লক্ষণ হতে পারে। যদিও এনলারজড প্রস্টেট এর কারণেও এমনটা হতে পারে। ডা. নর্টন বলেন, ‘সমস্যা হচ্ছে মনে করলে পুরুষদের প্রস্টেট পরীক্ষা করানো উচিত। কেননা টাইপ২ ডায়াবেটিস কখনো কখনো উপেক্ষিত হতে পারে।’
* অবসাদ
সারারাত টয়লেটে গিয়ে হয়তো আপনার শরীর ক্লান্ত বা অবসাদগ্রস্ত হয়েছে কিন্তু রক্তে ক্রমবর্ধমান শর্করাও ক্লান্তি বা অবসাদের কারণ হতে পারে। পর্যাপ্ত ইনসুলিন রক্তপ্রবাহ থেকে গ্লুকোজকে কোষে প্রবেশ করতে দেয় এবং শরীরের শক্তি সরবরাহ করার কাজ করে থাকে। ডা. নর্টন বলেন, ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগে আমার পিতামাতা প্রায় সারাবছরই ক্লান্ত থাকতেন। যদি অবসাদ আপনার কাছে নতুন কিছু হয়, তাহলে চিকিৎসকের কাছে যান।’
* পরিবারিক রোগের ইতিহাস
আপনার পরিবারের কারো কি টাইপ২ ডায়াবেটিস রয়েছে? এটি পুরুষদের ডায়াবেটিসের প্রাথমিক কারণগুলোর মধ্যে একটি হতে পারে অথবা এটি সংকেত দিতে পারে ভবিষ্যতে আপনার তা হতে পারে। ডায়াবেটোলজিতে প্রকাশিত ২০১৩ সালে ৮ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের পরিবারে টাইপ২ ডায়াবেটিসের ইতিহাস ছিল, তাদের ২৬ শতাংশের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ছিল। তাই পরিবারের মেডিক্যাল ইতিহাস জানা থাকা ভালো গুণ এবং তা মনে রেখে প্রতি তিন মাস পরপর রক্তের শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা ভালো।
* ওজন বৃদ্ধি
যদিও বয়সের সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি সাধারণ বিষয় কিন্তু এর ওপর দৃষ্টি রাখা দরকার। বিএমজে ওপেন জার্নালে ২০১৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ডায়াবেটিস থাকাকালীন নারীর তুলনায় পুরুষের ওজন কম কমে। তাই সামান্য পরিমাণ ওজন বাড়লেও তা নজরদারিতে রাখুন। রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়লে শুধু ক্ষুধা চেপে খেয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণ না করে বরঞ্চ লাইফস্টাইল পরিবর্তন করেও ওজনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
* ব্যায়ামের সময় বুকে ব্যথা
মেটাবলিক সমস্যা ডায়াবেটিসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, যেমন উচ্চ রক্তচাপ বুকে ব্যথা বা ইস্কিমিয়া সৃষ্টি করে। ব্যায়াম করা শরীরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ব্যায়াম ও বিশ্রামের মধ্যে একটা সমন্বয় করা প্রয়োজন। আস্তে আস্তে ব্যায়ামের ধরন ও গতি বাড়ানো আবশ্যক।
* দ্রুত বীর্যপাত
মেটাবলিক সমস্যার (যা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে) সঙ্গে জড়িত ইরেকটাইল ডিসফাংশনের মতো যৌন সমস্যা ছাড়াও দ্রুত বীর্যপাত সম্পর্কিত। এমনকি এটি পুরুষদের ডায়াবেটিসের অন্যতম একটি লক্ষণ হতে পারে। ইউরোপিয়ান ইউরোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২৩ শতাংশ রোগীর দ্রুত বীর্যপাত ও ৫ শতাংশ মানুষের দেরীতে বীর্যপাতের ঘটনা আছে। লাইফস্টাইলে পরিবর্তন, ওজন কমানো ও ব্যায়ামে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।
* কোনো লক্ষণ নেই
এটা ভীতিজনক- বিশেষ করে আপনি যদি ডায়াবেটিসের প্রাথমিক স্তরে থাকেন, কয়েক বছরে ধরে কোনো লক্ষণ প্রকাশ নাও পেতে। ডা. নর্টন বলেন, ‘ডায়াবেটিস নির্ণয়ের আগে মানুষজনের গড়ে ৬ থেকে ৭ বছর রক্তে শর্করার সমস্যা থাকতে পারে। এটা খুব ধীর প্রক্রিয়া।’ ২০১৭ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ৬ শতাংশ প্রাথমিক চিকিৎসকগণ সব ঝুঁকির কারণগুলো চিহ্নিত করতে পারেন যা স্ক্রিনিং করার সুপারিশ করে।’ তাই আপনার নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি নিজের খেয়াল রাখাটা গুরুত্বপূর্ণ। আপনার উদ্বেগ এবং প্রশ্নগুলো নিয়ে প্রতি বছরই চিকিৎসকের কাছে যান।
ডায়াবেটিসের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে, সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। ডায়াবেটিসের প্রাথমিক স্তরে রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, কিন্তু তা ডায়াবেটিস সম্পূর্ণ ভাবে নির্ণয় করার মতো যথেষ্ট নয়। হৃদরোগের সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো সমস্যায়ও চিকিৎসক দেখান। ডা. নর্টন বলেন, ‘নারীদের তুলনায় পুরুষদের হার্টের সমস্যা আগে দেখা দেয়। তাই নিয়মিত চেকআপ এবং স্ক্রিন করান- বিশেষ করে যদি আপনার পরিবারিক উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকে।’
তথ্যসূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট

ভাগ