নজিরবিহীন সংকটে দেশ

রোহিঙ্গা শরনার্থীদের নিয়ে বাংলাদেশ একটি নজিরবিহীন সংকটে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত বুধবার ১০ম জাতীয় সংসদের আঠারতম অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে বক্তৃতা দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। গত আগস্ট মাস থেকে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও মগ সন্ত্রাসীদের গণহত্যার মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক সমস্যার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। রোহিঙ্গা গণহত্যা ও শরনার্থী সমস্যা ইতিমধ্যেই সব আন্তর্জাতিক ফোরামে আলোচিত হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট,অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইট ওয়াচ, ওআইসিসহ সব সংস্থাই মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের জাতিগত নিধন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনে উদ্বেগ প্রকাশ করে এ বিষয়ে কার্যকর ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহŸান জানিয়েছে। বিশ্বসম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকটের ন্যায্য ও মানবিক সমাধান চায়। সর্বশেষ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ বৈঠকে ১৫ জাতির নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতিতে মিয়ানমারে গণহত্যা বন্ধের আহŸান জানায়। ঢাকায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েল্থ পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সভায়ও অনুরূপ আহŸান জানানো হয়। এসব আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে গঠিত কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের প্রতি ঐকমত্য দেখা গেলেও সংকট সমাধানে প্রকৃত অনুঘটকদের তেমন কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় রোহিঙ্গা সংকট এখনো একটি দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক ইতিহাসে রোহিঙ্গারা বিশ্বের অন্যতম নির্যাতিত ও অধিকারবঞ্চিত জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ঔপনিবেশোত্তর উপমহাদেশে রোহিঙ্গাদের অধিকার বঞ্চনার ধারাবাহিকতায় বিশ্বসম্প্রদায়ের নিরবতা ও নিস্ক্রিয়তার কারণেই এখন তারা জাতিগত নিধনযজ্ঞের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়ায় তা সারাবিশ্বেই প্রসংশিত হয়েছে। তবে গত কয়েক দশকে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরনার্থী আত্মীকরণ, দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান বা ভরনপোষনের ক্ষমতা যে বাংলাদেশের নেই তা সকলেরই জানা। জাতিসংঘের তরফ থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা গণহত্যার ঘটনাকে একটি ‘টেক্সটবুক রেফারেন্স’ হিসেবে আখ্যায়িত করার পরও এই সমস্যা সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের তৎপরতা এখনো স্রেফ দায়সারা গোছের বিবৃতি এবং যৎসামান্য ত্রান সহায়তার মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ রয়েছে। যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলো থেকে পালিয়ে যাওয়া কয়েক লাখ রিফিউজির সংকট পশ্চিমাবিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো সম্মিলিতভাবে মোকাবেলা করতে হিমসিম খাচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের মত জনবহুল, দরিদ্র দেশকে এককভাবেই ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরানার্থীর সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এত স্বল্প সময়ে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা শরনার্থীর আবাসন, খাদ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের সরকার, সাধারণ জনগন এবং সেনাবাহিনী এ কঠিন চ্যালেঞ্জ সফলতার সাথেই মোকাবেলা করছে।
এতবড় একটি শরনার্থী সংকট এবং আঞ্চলিক সমস্যার সমাধান করা এককভাবে বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। বিভিন্ন সময়ে বিশ্বসম্প্রদায়ের তরফ থেকে রোহিঙ্গা সমস্যা মিয়ানমারের সৃষ্ট এবং এর সমাধান তাকেই করতে হবে বলে বলা হলেও এ বিষয়ে যে মিয়ানমারের কোন সদিচ্ছা নেই তা বিভিন্নভাবে প্রমানীত হয়েছে। মিয়ানমার এমন কোন আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক শক্তি নয় যে আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে তার পক্ষে এ ধরনের মানবতাবিরোধি জাতিগত নিধন তৎপরতা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। রাখাইনে আগস্ট থেকে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা মানবিক বিপর্যয়ের শুরু থেকেই বিশ্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। চীন, রাশিয়া ও ভারতের মত শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ও ভ‚রাজনৈতিক কারণে মিয়ানমারের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা রদশগুলো রাখাইনে সেনাবাহিনীর অভিযান বন্ধ, বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবী জানালেও আদতে তাদের কারো অবস্থান সুদৃঢ় নয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারনের মিয়ানমার সফরের সময় দেয়া বক্তব্য বিবৃতি হতাশাজনক। টিলারসনের বক্তব্যের সঙ্গে মার্কিন সরকারের আগের ঘোষিত অবস্থানের মিল নেই। যেখানে বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের প্রত্যাশা করা যাচ্ছেনা সেখানে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নমনীয় অবস্থান সংকটকে আরো দীর্ঘায়িত করতে পারে। রোহিঙ্গারা একটি পিছিয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠি। তাদের কোন শক্ত রাজনৈতিক বা ক‚টনৈতিক প্লাটফর্ম নেই। মিয়ানমার সুপরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এই সমস্যার দ্রæত সমাধান প্রয়োজন। সর্বশেষ আসিয়ান শীর্ষসম্মেলনে চেয়ারম্যানের বিবৃতিতে রাখাইনের সংখ্যালঘুদের কথা উঠে আসলেও মিয়ানমারের চাপে‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি পরিহার করা হয়েছে। চীন ও ভারতের মত আঞ্চলিক প্রভাবক দেশগুলোরও রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক ও রাজনৈতিক দায় রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের সৃষ্ট, এই সমস্যা নিরসন মিয়ানমারের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া যায়না। আনান কমিশন এবং বিশ্বসম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে উঠে আসা সুপারিশের আলোকে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বসম্প্রদায়ের সম্মিলিত চাপ এবং চীন, রাশিয়া ও ভারতের প্রভাব কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ বাংলাদেশকেই গ্রহন করতে হবে। আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও দৃঢ় পদক্ষেপের মাধ্যমেই এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ ও নিশ্চিত সমাধান হতে পারে। বাংলাদেশকে এর জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। মনে রাখতে হবে। দুর্বল কূটনৈতিক তৎপরতা ও বিবৃতি দিয়ে এ সংকটের সমাধান হবেনা।

ভাগ