ধর্ষণের মহোৎসব এবং যৌনকর্মের অতীত বর্তমান

আনিস আলমগীর

সারাদেশে ধর্ষণের মহোৎসব দেখে লিখবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। হঠাৎ ফেসবুকে চোখ পড়লো তাহেরা বেগম জলি আপার স্ট্যাটাসে। আপা সমাজকর্মী, এক সময় সক্রিয় রাজনীতি করতেন। আমি যা বলতে চাইছি আপা সেটাকেই তার ছাত্ররাজনীতির জীবনে দেখা একটি ঘটনায় তুলে ধরেছেন। সেখান থেকে কিছুটা পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি,
‘‘ঝিনেদা শহরেও একদিন দেখলাম মিছিল বের হয়েছে। একজন স্লোগান দিচ্ছে, ‘বেশ্যাখানা তুলে দিতেই হবে’। বলা ভালো, স্লোগান দাতা আমার খুবই পরিচিত। ওই পরিবারের তিন পুরুষ সম্পর্কে আমি প্রায় সব কিছুই জানি! যাই হোক, এই সস্তা স্লোগানের বেশ ভক্তও জুটে গেলো। ঝিনেদা শহরের পতিতালয়টি ছিল অত্যন্ত লোভনীয় জায়গায়। মূল আকর্ষণ ছিল সেখানেই।
তখন ঝিনেদা ছিল মহাকুমা। সেখানে তখন এসডিও ছিলেন, শফিউল করিম নামে এক ভদ্রলোক। পতিতালয়বিরোধী এই চক্রান্ত ভদ্রলোকের কাছে ভালো লাগেনি। তৎকালীন সংসদ সদস্য গোলাম মোস্তফা এবং আরও দুই/একজনকে নিয়ে, তিনি একদিন ভোরের দিকে সেই যৌনালয়ে হানা দিলেন। সৌভাগ্যক্রমে আমিও সেদিন ওই দলে ছিলাম।
এবার আসবো দুঃখের বয়ানে। নারী সমাজের ওপর এই যে বিভৎস যৌন আক্রমণ নেমে এসেছে, যৌনজীবীদের যৌনালয় উচ্ছেদ কিছুটা হলেও এখানে ইন্ধন হিসেবে কাজ করেছে। আমি ওই ভোরে যাদের ঝিনেদার পতিতালয়ে পতিত হতে দেখেছি, দিব্য চোখে দেখতে পেয়েছি, তারা এক ধরনের যৌন আসক্ত মাতাল। বিশেষ ধরনের চিকিৎসা ছাড়া, তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। ধীরে ধীরে ওরা এক ধরনের বিষাক্ত ভ্যাম্পায়ারে পরিণত হয়ে গেছে। যৌন আসক্ত এই ভ্যাম্পায়াররা সমাজের খোলা ময়দানে বিচরণ করার সুযোগে, সামনে যাকে পাচ্ছে, তাকেই ছিঁড়ে-খু্ঁড়ে খাচ্ছে। এমনকি আড়াই/তিন বছরও ওদের কাছে কোনও বাধা নয়।
প্রশ্নটা এসে দাঁড়িয়েছে, বিকৃত নরপশুকে খাঁচা বন্দি করবো, নাকি সমস্ত নারী সমাজকে ঘরে তুলে দেবো!’’ তাহেরা বেগম জলির মতো এখন এই প্রশ্ন অনেকের মনে—আমরা কি নরপশুদের খাঁচাবন্দি করবো, মানে পতিলালয়ে রাখবো, নাকি সারাটা দেশকে পতিতালয় বানিয়ে ছাড়বো? আমার আরেক সাবেক সহকর্মী কামরুন নাহার রুমা তার নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করে কিছুদিন আগে কলাম লিখেছেন, ‘এই শহরে যৌনপল্লী দরকার’।
পতিতালয়, যৌনালয়, বেশ্যালয়, রেড লাইট এরিয়া—যে নামেই ডাকি না কেন, এসব আমাদের সমাজের জন্য নতুন কিছু নয়। আমাদের শহরে-বন্দরে আগে পতিতালয় ছিল। আইন ছিল, কোনও মহিলা ইচ্ছে করলে প্রথম শ্রেণির হাকিমের আদালতে অ্যাফিডেভিড করে তার জীবন জীবিকার উপায় হিসেবে পতিতালয়ে চলে যেতে পরতো। পুরুষদেরও এত ঝামেলা ছিল না। মুখটা একটু আড়াল করে পতিতালয়ে ঢুকে যেত। কিন্তু তথাকথিত সভ্যতার নাম করে, আধুনিকতার নাম করে, ধর্মের অনুরাগের বশবর্তী হয়ে গত শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে পতিতালয় উচ্ছেদের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। পতিতালয় উচ্ছেদের নেতৃত্ব দিতো মুসলিম লীগ নেতারা। শুনেছি আমার জেলা শহর চট্টগ্রামের পতিতালয় ছিল বর্তমান রিয়াজউদ্দীন বাজারে। তখন বাজারটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মুসলিম লীগ ছিল দুই গ্রুপে বিভক্ত। রফিক উদ্দীন ছিদ্দিকী গ্রুপ আর ফজলুল কাদের চৌধুরী গ্রুপ। পতিতালয়ের জায়গাটা ছিল রফিক উদ্দীন ছিদ্দিকীর। দেড়/দুই হাজার পতিতা ছিল। রফিক উদ্দীন ছিদ্দিকী প্রচুর ভাড়া পেতেন ওই পতিতালয় থেকে।
প্রত্যেক বন্দরের পতিতালয়ে নাকি খুব সুন্দরী পতিতারা থাকতো। কারণ বন্দরে জাহাজ ভিড়লেই নাবিকেরা পতিতালয় খোঁজ করে চলে যেত। গ্রুপিংয়ের কারণে ফজলুল কাদের চৌধুরী একদিন শুক্রবার মুসল্লিদের নিয়ে এসে রিয়াজউদ্দীন বাজারের পতিতালয় তুলে দিয়েছিলেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী রফিকউদ্দীন ছিদ্দিকীর জনপ্রিয়তায়ও আঘাত লাগলো আবার আর্থিক ক্ষতিও হলো। ওই পতিতালয় পরে গিয়ে বন্দরের কাছে মাঝির ঘাটে পুনঃস্থাপিত হয়েছিল। এখন অবশ্য সেটাও তুলে দেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ছিল নৌবন্দর। টানবাজারের পতিতালয় ছিল বড় পতিতালয়। ঢাকার নাগরিকদের জন্যও এটি সুবিধাজনক স্থানে ছিল বলা চলে। আমি কখনও নারায়ণগঞ্জ যাইনি, তাই জানি না এলাকাটি ঠিক কোথায় এবং শহরবাসীর কী সমস্যা করেছিল। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসলে শামীম ওসমান টানবাজার থেকে পতিতা উচ্ছেদ করেন। সে পতিতারা ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার রাস্তায় রাস্তায়। আন্দোলন-সংগ্রামও করেছিল তারা।
মফস্বল এলাকার মাঝে দাউদকান্দির গৌড়িপুরে পতিতালয় ছিল। ব্রিটিশেরা উদ্যোগ নিয়ে এ পতিতালয়টা নাকি প্রতিষ্ঠা করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের প্রয়োজনে। ঢাকা শহরেও কান্ধুপট্টি, ইংলিশ রোডে পতিতালয় ছিল। দৌলতদিয়া ঘাটে রয়েছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম পতিতালয়। মাঝে মাঝে সেটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে খবর হয়ে আসে নানা অনিয়মের কারণে, শিশু কিংবা কোনও নারীকে জোর করে রাখা হয়েছে বলে। এখন প্রায় জেলা থেকে পতিতালয় উচ্ছেদ হয়ে গেছে বলা চলে।
অভিজাত শহরে যেমন কলকাতা, দিল্লিতে পতিতালয় ছাড়াও নিজস্ব ঘরে বাইজিরা থাকতো, নাচে গানে ভরপুর ছিল বাইজির দরবার। বড় বড় জমিদাররাও বাইজির ঘরে যেতেন। কলকাতার হীরা বুলবুলি নামক বাইজিকে নিয়ে বাবু সম্প্রদায়ের মাঝে বিভক্তি এসেছিল। হীরা বুলবুলির ছেলের হিন্দু কলেজে অ্যাডমিশন নিতে আসায় এসেছিল এ বিভক্তি। কিছু বাবু হীরা বুলবুলির ছেলের অ্যাডমিশনের পক্ষে ছিলেন আর কিছু বাবু বিরুদ্ধে ছিলেন। বাবুদের কলহে হিন্দু কলেজ বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। পরে ব্রিটিশেরা এ কলেজেই প্রেসিডেন্সি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিল। পাশের দেশ বার্মায় ছিল বাইজিদের মতো নাচ। রেঙ্গুনে বাঙালি পয়সাওয়ালারা ওইসব যৌনাত্মক নাচে প্রচুর পয়সা খরচ করত। গত শতকের শেষ সময় পর্যন্ত ছিল আইনসম্মতভাবে মানুষের যৌনকর্ম সমাধানের এসব কেন্দ্রস্থল।
পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ছেলেদের বেশ্যালয় আছে। এমন কী পূর্ব এশিয়ার হংকং, মেকং দ্বীপেও ছেলে বেশ্যালয় দেখা যায়। লস এঞ্জেলেসে ছেলে মানুষের বেশ্যালয়ে ইউরোপের লোকেরা ছুটি কাটাতে যায়। এ শতকের বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো সারাজীবন বছরে তিন মাসের জন্য লস এঞ্জেলসে যেতেন এবং যৌনপল্লীতে কাটিয়ে আসতেন। তিনি ছিলেন চিরকুমার। এ বর্ণনা তার লেখায়ও রয়েছে। তার মৃত্যু হয়েছে এইডস রোগে আক্রান্ত হয়ে। বিশ্বের অনেক দেশে মেয়েদের জন্যও রয়েছে ছেলে যৌনপল্লী। বাংলাদেশে এখন যৌনকর্ম করার নিরাপদ কোনও স্থান আর নেই। সবই উচ্ছেদ হয়ে গেছে। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি আরেকজন প্রাপ্ত বয়স্ক নর-নারীর সঙ্গে যৌনসঙ্গম করতে হোটেলে গেলেও রক্ষা নেই। কোনও ফ্ল্যাট বাড়িতে গেলেও হামলা করছে পুলিশ। হোটেলে স্বামী-স্ত্রী রাত্রি যাপন করতে হলেও কাবিননামা দেখানোর মতো অবস্থা চলছে কোথাও কোথাও। একজন তরুণ একজন তরুণীর সঙ্গে একান্তে কোথাও বসে আলাপ করছে বা প্রেমিক প্রেমিকাকে চুমু খাচ্ছে—তাতেও পুলিশের সমস্যা, হেনস্তার শিকার হয় ওইসব তরুণ-তরুণীকে। মানুষের অসম্মত যৌনমিলনে বাধা দেওয়া, প্রতিরোধ করা ও বিচারে দৃষ্টান্ত রাখতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হলেও, স্বাভাবিক যৌনমিলনে বাধা দেওয়ার জন্যই যেন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে।
ফলে আমরা কী দেখছি? এখন যৌনকর্মও একটা আগ্রাসীরূপ নিয়েছে। প্রত্যেকদিন খবরের কাগজে দুই/চারটা ধর্ষণের খবর আমরা দেখতে পাবোই। সেখানে ৩ বছরের শিশুও রক্ষা পাচ্ছে না হায়নাদের হাত থেকে। মেয়েকে ধর্ষণ-নির্যাতনের পর মা-মেয়েকে তুলে নিয়ে ন্যাড়া করে দেওয়া হচ্ছে। ক্ষমতাসীন লোকেরা ক্ষমতা পেয়ে যৌনতাতে আগ্রাসী হচ্ছেন বেশি। স্বাভাবিক যৌনতায় ব্যর্থ হয়ে অনেকে সমকামিতা, পরকীয়ার পাশাপাশি পশুকামিতাসহ যত নোংরামি, অনাচার আছে সেখানে যৌনতা মিটাতে চাচ্ছেন। এখন খোলা বাজার অর্থনীতির দুনিয়া। অর্থনীতির সুবাতাস সর্বত্র, বাংলাদেশেও। ক্ষমতা আর অর্থবিত্ত দু’টি হাতে এলে রিপু দুরন্ত হয়ে ওঠে। মাথার মাঝে গণধর্ষণের শখও জাগে। আবার ওই ধর্ষণের ভিডিও করারও শখ হয়। আপন জুয়েলার্সের মালিক তার ছেলেকে নাকি দৈনিক দুই লাখ টাকা হাত খরচে দিতেন। এত টাকা খরচ করবে কোথায়? শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপনে এত বেশি খরচ হয় না। সুতরাং উত্তেজনাপূর্ব কাজে জড়িত হয়ে পড়ছে টাকাওয়ালারা। উত্তেজনার কাজে আনন্দও বেশি।
বাংলাদেশের সমাজটা এখন দুর্যোগের মধ্যে চলছে যৌনকর্ম নিয়ে। একদিকে চলছে যৌন অবদমন আরেক দিকে চলছে যৌনাচার। ধর্ষণ এখন নিত্য। যেন উৎসবে পরিণত হয়েছে। আমাদের সমাজ নারী-পুরুষের যে টুকু স্বাধীনতা দরকার, তা দিতে আপত্তি করছে না কিন্তু তারা এ স্বাধীনতা ভোগ করতে সবাই প্রস্তুত নয়। অসাধু উদ্দেশ্য নিয়ে ছল করার মতলব অনেকের। অনুরূপ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপক্ষও নিরাপত্তার নিশ্চিয়তা দিতে পারে না। বাংলাদেশে ধর্ষণের যে মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে প্রতিটি ঘরকেই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বানাতে হবে। ঘরেই ছেলে-মেয়েকে উশৃঙ্খল আচরণ পরিহারের পথ দেখাতে হবে। মা-বাবাকে সে বিষয়ে মনিটরিং করতে হবে। রাষ্ট্রের পক্ষে সে মনিটরিং করা সম্ভব নয়। তবে ধর্ষণ বাড়ার কারণ উৎঘাটন করে দমনের জন্য সমাজপতি ও রাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবতে হবে। ভাবতে হবে পতিতালয় সম্পর্কেও।
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক

ভাগ