দুদকের হয়রানি বন্ধ করতে হবে

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠিত হয়েছিল দেশের মধ্যে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ কায়েমের লক্ষ্যে। অত্যন্ত দু:খজনক হলেও বলতে হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটি এক্ষেত্রে তেমন কোনো ভূমিকা ও অবদান রাখতে পারেনি। উল্টো এটি একটি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানে পর্যবসিত হয়েছে। এর স্বাধীন চরিত্র কখনোই লক্ষ্যযোগ্য হয়ে ওঠেনি। কার্যত এটি সরকারের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চরিতার্থ করার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি দমনের চেয়ে সরকারের রাজনৈতিক বিরোধী কিংবা সরকারের পক্ষে নয় এমন ব্যক্তিদের দমন-পীড়নের ক্ষেত্রে তার অধিকতর মনোযোগ সহজেই প্রত্যক্ষ করা যায়। রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, এমনকি সাধারণ মানুষও তার অত্যাচার-জুলুম ও হয়রানি থেকে রেহাই পায়নি বা পাচ্ছে না। যারা সম্মানী রাজনীতিক, কিংবা যারা দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরি-বাকরি করে আসছেন তারা দুদকের হয়রানি ও সামাজিক মর্যাদাহানির ভয়ে রীতিমত আতংকের মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। দুদক যখন তখন যাকে ইচ্ছা তাকে নোটিশ দিচ্ছে ও তলব করছে। বৈধ সম্পত্তির পাশাপাশি অবৈধ সম্পত্তি আছে কিংবা বিদেশে টাকা পাচারে জড়িত-এ জাতীয় সন্দেহ পোষণ করে তুলে নোটিশ দেয়া হচ্ছে, তলব করা হচ্ছে, করা হচ্ছে জিজ্ঞাসাবাদ। নামোল্লেখ না করেই বলা যায়, অনেক সুখ্যাত রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা দুদকের নোটিশ, তলব ও জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হয়েছেন এবং এখনো হচ্ছেন। এর সার্বিক প্রতিক্রিয়া হচ্ছে খুবই নেতিবাচক। দুদক-আতংকে বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকের ঋণ ও বড় লেনদেন বলতে গেলে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেকেই বিনিয়োগে কোনো আগ্রহ দেখছেন না, ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন না, ব্যাংকাররাও ভয়ে ঋণ প্রদানসহ ব্যবসায়িক সহযোগিতা দিতে চাইছেন না। সরকারি বিনিয়োগ ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ হচ্ছেই না। হাউজিংসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাত প্রায় বসে গেছে। ব্যাংকখাতের পরিস্থিত শোচনীয়। দেশের জন্য এ পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
শেয়ার বাজার লুণ্ঠন, ব্যাংক খাতে ভয়ংকর অনিয়ম-দুর্নীতি ও অর্থ লোপাট, লাগাতার অর্থপাচার ইত্যাদি নিয়ে দুদকের কোনো মাথা ব্যথা নেই। এসব আর্থিক দুনীতি ও কেলেংকারির খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলেও এবং এসবের সঙ্গে কারা জড়িত তা অনুমানযোগ্য হলেও দুদক এসব ব্যাপারে অনেকটাই নিরব। একথা অনেকেই বলেছেন এবং বলে থাকেন, ক্ষমতাসীনদের একাংশ, তাদের আত্মীয়-স্বজন ও অনুগত ব্যক্তিবর্গ এই সব আর্থিক দুনীতি, অপকর্ম ও অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত। সম্ভবত এ কারণেই দুদক তাদের বিষয়ে নিরাসিক্ত ও নিশ্চুপ। দুদকের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা কেও অস্বীকার করে না। দুর্নীতি নিরোধ এবং সকল ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার জন্য দুদক একটি অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান বটে। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই হতে হবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। তার কাজের মধ্যে থাকতে হবে স্বচ্ছতা। আমরা দেখছি, দুদক দ্বৈতনীতি অনুসরণ করছে। সরকারের রাজনৈতিক বিরোধী বা সরকারের পুরোপুরি অনুগত নয় এমন ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে দুদক খুবই তৎপর। আরও স্পষ্ট করলে বলতে হবে, তাদের ওপর খড়গহস্ত। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন ও তাদের রাজনৈতিক মিত্র-অনুগতদের প্রতি খুবই সহৃদয় ও সহানুভূতিশীল। তাদের অনেককে ‘দুর্নীতিমুক্ত’ সার্টিফিকেট দিতে দেখা গেছে দুদকের। তাদের অনেককে অভয় ও দায়মুক্তি দেয়ার প্রবণতাও কারো চোখ এড়িয়ে যায়নি। ভারতের কত লোক এখানে কাজ করছে, কী পরিমাণ অর্থ ভারতে চলে যাচ্ছে বা পাচার হচ্ছে প্রতিবছর, সে বিষয়ে দুদকের কোনো খোঁজ নেই। এক্ষেত্রে তার দায়িত্বশীলতা লক্ষ্য করা যায় না। অথচ কোন অফিসের কোন ক্ষুদ্র কর্মচারী কার কাছে থেকে দুই-একশ টাকা ঘুষ নিলো তা ধরার জন্য দুদক ফাঁদ পাতে। আমরা ঘুষ নেয়াকে সমর্থন করছিনা। শুধুমাত্র তুলনা দেয়ার জন্যই এই উল্লেখ। বস্তুত : দুদকের প্রতি নিম্নতম আস্থাও জনগণের নেই। একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা তার উপযোগিতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সরকারের তরফে সব সময় উন্নয়নের কথা বলা হয়। দেশে উন্নয়নের জোয়ার চলছে, এমন দাবিও করা হয়। উন্নয়নকে নির্বাধ, দ্রুতায়িত ও টেকসই করতে হলে দুর্নীতি নিরোধ, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, চলতি বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৮ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ হতে পারে। তার এই আশাবাদ অত্যন্ত উদ্দীপনামূলক। অবশ্য এক্ষেত্রে অপরিহার্য পূর্বশর্ত হলো, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্রুত প্রসার। এজন্য একটি অনুকূল পরিবেশ দরকার। দুদক যেভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে, ভীতির বিস্তার ঘটাচ্ছে, উদ্দীপক মনোভাবকে দমিয়ে দিচ্ছে, তাতে অনুকূল ও অভয় পরিবেশ দূরপরাহত। দুদকের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অবাধ প্রসারে সহায়তা করা। সেটা তার কাজের মাধ্যমেই করতে হবে। টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক হয়রানির হাতিয়ার হিসাবে দুদককে ব্যবহার করা হয়। আমরা সেনাসমর্থিত তত্ত্ববাধায়ক সরকারের সময়ে দেখেছি, সে সময় বিরাজনীতিকরণের ক্ষেত্রে দুদককে ব্যবহার করা হয়। রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে ব্যবস্থা নেয়া হয়। এতে রাজনীতি কোনঠাসা হয়ে পড়ে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে অচলাবস্থা নেমে আসে। সে সময়ে গৃহীত পদক্ষেপের জের এখনো চলছে এবং নতুন করে একই পরিস্থিতি সৃষ্টির তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। মন্ত্রীপরিষদ ও সরকারকে বিষয়টি অবিলম্বে আমলে নিতে হবে। দুদকের আতঙ্ক সৃষ্টি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হয়রানি শূণ্যে নামিয়ে আনতে হবে। এমন একটা পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বিনিয়োগও ব্যবসা-বাণিজ্য উৎসাহিত হয়। মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন যখন হয় তখন অনিয়ম-দুর্নীতিও কিছু হয়। সব দেশেই এটা লক্ষ্য করা যায়। দুদকের কাজ হতে হবে, সেই দুর্নীতি যেন ন্যুনতম পর্যায়ে থাকে তার নিশ্চয়তা বিধান করা এবং সকল ক্ষেত্রে সমদৃষ্টি প্রদর্শন করা।

ভাগ