তীব্র শীত-ঘন কুয়াশায় যশোরে নষ্ট হচ্ছে বীজতলা, হুমকির মুখে বোরো আবাদ

আকরামুজ্জামান ॥ তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশায় যশোরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ধানের বীজতলা। এর ফলে জেলায় এবার বোরো আবাদ হুমকির মুখে পড়েছে। কৃষক বলছেন, শৈত্যপ্রবাহ প্রলম্বিত হলে এ অঞ্চলের শতভাগ বীজতলা কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হবে। এর ফলে বোরো চাষের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। চলতি জানুয়ারির ৪ তারিখ থেকে যশোরসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহের কারণে তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা নেমে আসে ৫-৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। সেই সাথে প্রকৃতি ঢেকে যায় ঘন কুয়াশায়। শীত-কুয়াশায় প্রকৃতি যখন বৈরী হয়ে ওঠে তখন মাঠে মাঠে প্রস্তুতি চলছে বোরো আবাদের। বিস্তীর্ণ মাঠে রয়েছে বোরোর বীজতলা। তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশা সহ্য করতে পারেনি বীজতলায় থাকা এসব ধানের চারা। বেশিরভাগ স্থানেই তা নষ্ট হয়ে গেছে কোল্ড ইনজুরিতে। যেগুলো ভালো আছে তা নিয়ে চিন্তায় কৃষক।
কৃষক বলছেন, বিগত আমন মৌসুমে ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে তারা লাভের মুখ দেখতে পারেননি। বোরো আবাদ করে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই তাই তারা ব্যাপক প্রস্তুতি নেন। গতবছরের চেয়ে বেশি দামে ধান বীজ কিনে বীজতলা তৈরি করেন তারা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাপমাত্রার এ বিরুপ প্রভাবে ধান চাষ নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন। বীজতলা নষ্ট হওয়ায় দ্বিতীয় দফা চারা তৈরি নিয়ে শঙ্কিত চাষি। জেলার সদর উপজেলার বীর নারায়নপুরের চাষি জামাল হোসেন জানান, তিনি ৫ বিঘা জমির জন্য বীজতলা তৈরি করেন। যশোর বিএডিসি থেকে গত বছরের চেয়ে ১০ কেজির বস্তায় ১০০ টাকা বেশি দিয়ে ধান বীজ কিনে বীজতলা তৈরি করেছেন। গত কয়েকদিনের তীব্র ঠান্ডায় বীজতলা সাদা হয়ে গেছে। কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়ে ধানের চারা গজাচ্ছেনা। তিনি বলেন, শীত বিলম্বিত হলে বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাবে। একই কথা জানান, ইছালী এলাকার কৃষক আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন, বোরো চাষের জন্য কৃষকরা আমন ও বোরো মৌসুমে নিজস্ব উদ্যোগে ধানের বীজ সংগ্রহ করে আসলেও বিগত কয়েক বছর ধরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সম্ভব হয়নি। আমন ও বোরো মৌসুমে কয়েক দফা টানা বৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে ধান বীজ সংগ্রহ করতে না পারায় বিএডিসি ও বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে ধানের বীজ কিনে বীজতলা দেয়া হয়েছে। অথচ সেই বীজতলা এখন তীব্র শীতের কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বীজতলা নষ্ট হলে কৃষককে দ্বিতীয় দফা বীজতলা তৈরি করে বোরো আবাদ করা ঝুঁকি হয়ে যাবে। কৃষক রফিউদ্দীন বলেন, এমনিতো ধান আবাদে তেমন কোন লাভ নেই। তারপর যদি বীজতলা নষ্ট হয়ে যায় তাহলে আমার আর উপায় থাকবেনা। তিনি বলেন, আমনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষককে চরমভাবে লোকসান গুনতে হয়েছে। এখন যদি বোরো আবাদেও লোকসান করতে হয় তাহলে আমাদের আর কোন উপায় থাকবে না।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কাজী হাবিবুর রহমান বলেন, জেলায় এবছর ১ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ধান আবাদকে টার্গেট করে কৃষক ইতিমধ্যে ৮ হাজার ৫শ’ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করেছেন। ইতিমধ্যে কিছু এলাকায় ধান রোপণের কাজও শুরু করেছেন কৃষক। তবে সাম্প্রতিক যশোরাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শৈতপ্রবাহে কিছু কিছু বীজতলা নষ্ট হলেও অধিকাংশ এলাকার কৃষক কোল্ড ইনজুরি থেকে রক্ষা পেতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, এবছর বোরো আবাদকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জেলার অধিকাংশ এলাকায় কৃষক আদর্শ বীজতলা তৈরি করেছেন। যারা আদর্শ বীজতলা তৈরি করেছেন তাদের ক্ষতি কম হচ্ছে। তিনি বলেন, বীজতলাকে কোল্ড ইনজুরি থেকে রক্ষা করতে কৃষককে জমিতে সেচ ও পলিথিং দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, দু’একদিনের মধ্যে তাপমাত্রা বাড়লে কৃষকের চিন্তা থাকবে না।

ভাগ