কেন অবিচার আমাদের সঙ্গে

নাদীম কাদির
সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা যা শুধু সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত একটি চাকরি নয়। সাংবাদিকতা হচ্ছে একটি ভালোবাসা, একটি প্রেম। অন্তত আমার জন্য তাই। কিন্তু পেশাগত সমস্যা নিয়ে মাঝে মধ্যে লিখি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। আমরা যে কাঁটাযুক্ত সময় পার করেছি, তাদের যেন সেটা করতে না হয়। তা ছাড়া পূর্বসূরিরা যা করতে পারেননি আমাদের জন্য, সেটাও আমি মনে করি আমাদের করার প্রয়োজন আছে। সবচেয়ে মোক্ষম বিষয় হলো, সম্মান ও ইজ্জত আছে যা আজকাল তার বড়ই ঘাটতি দেখছি কিছু কিছু ক্ষেত্রে। এ জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী অনেকাংশে বলে আমার মনে হয়।
সাংবাদিকদের চাকরি যাওয়া এখন কোনো বিষয় না। আবার চাকরি বদল করাও নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে গেছে। নতুন নতুন টেলিভিশন চ্যানেল, পত্রিকা। আর তার ওপর অনলাইন আছেই। অপেশাদারিত্ব বেড়েছে, হলুদ সাংবাদিকতাও বেড়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খবর বেশ দেখা যায়। মালিকপক্ষ আমাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের অবিচার চালিয়ে যান। এটাই বাস্তব এই পৃথিবীতে। আমি একবার একটা লেখা লিখেছিলাম সাংবাদিকতা নিয়ে এবং মালিকপক্ষের মনে হলো তাদেরও এই লেখাতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। কী তাজ্জব, আর আমি বুঝলাম আমি চলে গেলে তারা খুব খুশি হবে। আমিও পদত্যাগ করলাম। আমার কিছু সহকর্মী দারুণ খুশি। অন্যদের মধ্যে একজন মালিকপক্ষকে ওই লেখাটা হাতে দিয়ে উসকানি দিয়ে এসেছিলেন যেন আমার চাকরিটা না থাকে।
হায় আমাদের সহমর্মিতা! কিছুদিন আগে একজন সাংবাদিকের চাকরি চলে গেল। ঘটনাটা শুনে মনে হলো তার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। অনেকে বলল, উচিত শাস্তি হয়েছে, কারণ তিনি অনেককে বিপদে ফেলেছেন ‘গুটি’ চালিয়ে। কিন্তু আমার মনে হলো শাস্তিটা বেশি হয়েছে। তাই লিখতে বসলাম। কারও চাকরি খাওয়া অনেকের জন্য কোনো বিষয় নয়। কিন্তু আমার কাছে বিষয়টা খুব নিষ্ঠুর মনে হয়। চাকরি খাওয়া শেষ পদক্ষেপ, যখন সেই ব্যক্তিকে সাবধান করার পরও সে একই অন্যায় করে তখন হয়তো।
এই সাংবাদিক যা নিউজ তাই প্রচার করেছিলেন যা তার মতে ঠিক, যা কারও অপছন্দ হতেই পারে। কিন্তু তাই বলে তার চাকরি চলে যাবে সেটা আমার মানতে কষ্ট হচ্ছে। তার যদি আরেকটা চাকরি পেতে দেরি হয় তাহলে তার বাড়ি ভাড়াটা কেমন করে দেবেন, কেমন করে বাচ্চার স্কুলের বেতন দেবেন বা তার সংসার চলবে কী করে? আমার মতে, প্রথম পদ্ধতি হলো কারণ দর্শানোর নোটিস দিতে হবে। আর তারপর একদিনের বেতন কর্তন হতে পারে। একদিনের বাধ্যতামূলক ছুটি অথবা ডিমোশন করা হতে পারে। যাই করা হোক, আমাদের সম্মানটা দিতে হবে। কারণ সব মানুষেরই তা প্রাপ্য। মানবিক দিকটা আমাদের সবার থাকা প্রয়োজন। ভুপেন হাজারিকার সেই গান ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না!’ আমাদের সাংবাদিক নেতারা আশা করি, এই ব্যাপারটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন। আমি মনে করি, আমাদের সুখ-দুঃখ এসব দিকে আমাদের সম্মিলিতভাবে নজর রাখতে হবে। কারণ সবাই সবার নিজেরটা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
নাদীম কাদির: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

ভাগ